Monday, August 10, 2026

ডাল ও তেলবীজ প্রকল্পে অ’নিয়মের অ’ভিযোগ, পিডির বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি

সরকারের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির অন্যতম উদ্যোগ ‘ডাল ও তেলবীজ উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প’ বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি ও অভিযোগকারীদের দাবি, কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং কৃষকদের সহায়তার উদ্দেশ্যে নেওয়া এ প্রকল্পের বিভিন্ন কার্যক্রমে অনিয়ম, ভুয়া বিল-ভাউচার, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার এবং একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি অর্থ অপচয়ের ঘটনা ঘটেছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এসব কর্মকাণ্ডের কারণে কৃষি বিভাগের একটি অংশে শফিকুল ইসলামকে ‘গুপ্ত শফিক’ নামে সমালোচনা করা হচ্ছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে বীজ, সার ও আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি বিতরণের জন্য বরাদ্দ করা অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কাগজে-কলমে ব্যয় দেখানো হয়েছে। ভুয়া কৃষকের তালিকা তৈরি করে বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শনী খামার স্থাপনের নামে বিল তোলার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রদর্শনী খামারের বাস্তব অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের চাপ প্রয়োগ করে ভুয়া ভাউচারে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগও করেছেন তারা।

প্রকল্পের আওতায় বীজ ও কৃষি যন্ত্রপাতি কেনাকাটায়ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বাজারমূল্যের তুলনায় বেশি দামে নিম্নমানের বীজ কেনা হয়েছে এবং সেগুলো কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন এলাকায় প্রত্যাশিত ফলন পাওয়া যায়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি কৃষি যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে সরকারি অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সেমিনারের জন্য বরাদ্দ অর্থ ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণের পরিবর্তে স্বল্প সময়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে পুরো বরাদ্দ উত্তোলন করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত না হলেও ভুয়া উপস্থিতি তালিকা ও স্বাক্ষরের মাধ্যমে অর্থ তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের নামে টিএ/ডিএ বাবদ অর্থ উত্তোলন করা হলেও প্রকৃত মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে অবগত ছিলেন না বলেও অভিযোগ করেছেন অভিযোগকারীরা।

প্রকল্পের ভেতরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিতর্কিত নথিতে স্বাক্ষর করতে অনাগ্রহী কর্মকর্তাদের দূরবর্তী এলাকায় বদলি করা হয়েছে। বিপরীতে প্রকল্প পরিচালকের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তা ও সহযোগীদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণেই কৃষি বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী তাকে ‘গুপ্ত শফিক’ নামে অভিহিত করছেন বলে দাবি অভিযোগকারীদের।

অভিযোগকারীরা আরও জানান, প্রকল্পের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে একাধিক অডিট আপত্তি ও লিখিত অভিযোগ জমা পড়লেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের ধারণা, মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও প্রভাবের কারণে এসব অভিযোগ কার্যকর তদন্তের মুখ দেখেনি। তবে এ দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এলাকায় তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে আন্দোলনকারীদের দমনে শফিকুল ইসলাম সক্রিয় ছিলেন বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর শফিকুল ইসলাম নিজেকে ছাত্রদলের ত্যাগী ও বঞ্চিত কর্মী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করছেন এবং বিএনপির নাম ব্যবহার করে মন্ত্রণালয় ও বিএডিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে নেই।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একটি টেন্ডারে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত আরোপ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদারের দাবি, এ ধরনের শর্ত আরোপের ফলে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসা নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদার সুবিধা পেতে পারেন। তার ভাষ্য, গত ১৫ বছরে রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে অনেক ঠিকাদার কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ফলে নতুন এ শর্ত টেন্ডারে অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত করতে পারে।

এ ছাড়া কয়েকজন ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন, ঊর্ধ্বতন মহলকে ‘ম্যানেজ’ করার কথা বলে তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগেরও স্বাধীন কোনো প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে নেই।

অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ সীমিতসংখ্যক পরিচিত ঠিকাদারকে দেওয়া হয়েছে। এতে দরপত্রে প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেন। তাদের ভাষ্য, এ ধরনের প্রক্রিয়ার কারণে প্রকল্পের টেন্ডার-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় প্রকাশ্যে আসছে না।

সম্প্রতি বিএডিসির প্রকৌশলীদের নির্বাচনে শফিকুল ইসলামের অংশগ্রহণ নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বিএনপির নাম ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ থাকলেও তিনি নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থিত প্যানেল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহলে তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বলে তারা দাবি করেন।

তবে শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ডাল ও তেলবীজ উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের উদ্দেশ্য যথাযথভাবে বাস্তবায়ন এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। তাদের মতে, স্বাধীন ও সুষ্ঠু তদন্ত হলে প্রকল্পের বাস্তবায়ন কার্যক্রম, টেন্ডার প্রক্রিয়া, অর্থ ব্যয় এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয়ে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ