শনিবার, জুন ১৩, ২০২৬

র‍্যাব-পুলিশ দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ নয়, মূল্যস্ফীতি কমাতে চাই অর্থনৈতিক সংস্কার: অর্থমন্ত্রী

দেশের চলমান মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় র‍্যাব-পুলিশ বা প্রশাসনিক অভিযানের ওপর নির্ভর না করে কার্যকর অর্থনৈতিক নীতি, শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

১২ জুন রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বাজারে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে সরবরাহ শৃঙ্খলকে কার্যকর করতে হবে, ব্যবসার অদক্ষতা দূর করতে হবে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের অতিরিক্ত ব্যয় কমাতে হবে। সরকারের গৃহীত কাঠামোগত সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের মূলধন ঘাটতি এবং অতীতে অর্থ পাচারের কারণে দেশের অর্থনীতি চাপের মুখে রয়েছে। এসব কারণে মূল্যস্ফীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

তিনি জানান, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমাতে সরকার বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমানে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গঠন বা প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় লাগে, যা বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। পাশাপাশি উচ্চ সুদের হার, বন্দর ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা এবং প্রশাসনিক জটিলতাও ব্যবসার খরচ বাড়াচ্ছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সরবরাহ শৃঙ্খল পর্যবেক্ষণ, খাদ্য ও জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুত এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে বন্দর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দুর্নীতি কমানোর মাধ্যমে ব্যবসার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন।

সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রায় ১১ বছর ধরে জাতীয় পে-স্কেল পুনর্বিবেচনা হয়নি। এ সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা সমন্বয় করা প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, বৈধ আয় বৃদ্ধি পেলে প্রশাসনিক পর্যায়ে দুর্নীতির প্রবণতাও কমে আসবে।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি কঠিন রূপান্তর পর্ব অতিক্রম করছে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আগামী দুই বছর কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি অনুসরণ করতে হবে। এরপর ধীরে ধীরে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার হবে এবং আগামী কয়েক বছরে এর ইতিবাচক ফলাফল দৃশ্যমান হবে।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি পূর্বাচলে ১৬০ একর জমির ওপর একটি বিশ্বমানের ‘ক্রিয়েটিভ সেন্টার’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথাও জানান। সংস্কৃতি, বিনোদন ও পর্যটন খাতকে অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে এই প্রকল্পে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে।

এদিকে, আবাসন খাতে কালো টাকা ও কর ফাঁকি রোধে সারা দেশে মৌজাভিত্তিক ডিজিটাল জরিপ পরিচালনার পরিকল্পনার কথা জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, জমির সরকারি মূল্য ও প্রকৃত বাজারমূল্যের ব্যবধান কমিয়ে আনা গেলে কালো টাকা সৃষ্টির সুযোগ অনেকাংশে বন্ধ হবে।

সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, জমি ও ফ্ল্যাট নিবন্ধনের সময় প্রকৃত মূল্য গোপন করে কম মূল্য দেখানো একটি বড় ধরনের কর ফাঁকি। ভবিষ্যতে প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব অনিয়ম শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান দেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে ছড়ানো গুজব থেকে আমানতকারীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন ও তদারকি কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং আমানতকারীদের অর্থ নিরাপদ রয়েছে।

তিনি আরও জানান, অতীতে ব্যাংক খাত থেকে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে সরকার ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্স’ গঠন করেছে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বিদেশে থাকা অবৈধ সম্পদ জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী এই বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং অর্থনীতিবিদরা উপস্থিত ছিলেন।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ