শনিবার, মে ২৩, ২০২৬

দুদকের তদন্তে কর কর্মকর্তার বিপুল অ’বৈধ সম্পদের অ’ভিযোগ, মানি লন্ডারিংয়ের অনুসন্ধান শুরু

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক উচ্চপদস্থ কর কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থাটির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নিজের নামের পাশাপাশি ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ গড়ে তোলার একটি জটিল আর্থিক নেটওয়ার্কের তথ্য।

অভিযুক্ত কর্মকর্তা কাজী আবু মাহমুদ ফয়সাল বর্তমানে বগুড়ায় অতিরিক্ত কর কমিশনার (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে কর্মরত। এর আগে তিনি যুগ্ম কর কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দুদকের অভিযোগ, দায়িত্ব পালনকালে সেবাপ্রত্যাশীদের বিভিন্ন ফাইল আটকে রেখে অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের মাধ্যমে তিনি কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তোলেন।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, কাজী আবু মাহমুদ ফয়সাল নিজের নামে এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্তত ১৪ জনের নামে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জন করেছেন। অনুসন্ধানে প্রাথমিকভাবে প্রায় ১৭ কোটি ২১ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেলেও পরবর্তীতে মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ কোটি ১৬ লাখ টাকায়।

এর মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকার স্থাবর সম্পদ এবং ১১ কোটি ২১ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। স্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে রাজধানী ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট ও জমি। অন্যদিকে অস্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে ব্যাংক আমানত, সঞ্চয়পত্র ও শেয়ার বিনিয়োগ।

দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অভিযুক্ত কর্মকর্তা তার স্ত্রী, শ্বশুর-শাশুড়ি, ভাই-বোন, শ্যালকসহ ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের নামে সম্পদ ক্রয় করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, সম্পদের প্রকৃত মালিকানা ও উৎস গোপন করতেই এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় নিজের ও স্ত্রীর নামে একাধিক প্লট, পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে জমি এবং রাজধানীর অভিজাত এলাকায় উচ্চমূল্যের সম্পদ কেনা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে দলিলে সম্পদের মূল্য বাস্তব মূল্যের তুলনায় অনেক কম দেখানো হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ফয়সালের স্ত্রী আফসানা জেসমিনের নামে কেনা একটি প্লটের দলিল মূল্য মাত্র ১৮ লাখ টাকা দেখানো হলেও প্রকৃত ক্রয়মূল্য ছিল প্রায় ৭৫ লাখ টাকা। একইভাবে তার শাশুড়ির নামে আফতাবনগর এলাকায় কেনা একটি প্লটের দলিলে ৫২ লাখ টাকা উল্লেখ থাকলেও প্রকৃত মূল্য ছিল প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা বলে দাবি করেছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র।

এ ছাড়া শ্বশুর আহমেদ আলীর নামে ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় প্রায় ৩ হাজার বর্গফুটের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের তথ্যও পেয়েছে দুদক।

অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও তার স্বজনদের নামে বিপুল অঙ্কের আর্থিক বিনিয়োগের তথ্যও উঠে এসেছে তদন্তে। দুদকের তথ্য অনুযায়ী—

  • প্রায় ২ কোটি ৫৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র
  • প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ টাকার শেয়ার বিনিয়োগ
  • প্রায় ৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকার ব্যাংক আমানত

বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এসব অর্থ জমা রাখা হয় বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুদকের অভিযোগ, অবৈধ আয়ের উৎস, প্রকৃতি, মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ গোপন রাখতে অভিযুক্ত কর্মকর্তা বিভিন্ন আত্মীয়ের নামে ব্যাংক হিসাব খুলে অর্থ স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে মানি লন্ডারিংয়ের চেষ্টা করেছেন। তদন্তে বলা হয়েছে, একটি হিসাব থেকে অন্য হিসাবে অর্থ স্থানান্তর, সঞ্চয়পত্র ক্রয় এবং বিভিন্ন বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থ বৈধ করার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে।

অনুসন্ধান সূত্রে জানা গেছে, স্ত্রী আফসানা জেসমিন, ভাই কাজী খালিদ হাসান, শ্বশুর আহমেদ আলী, শাশুড়ি মমতাজ বেগম, শ্যালক আফতাব আলীসহ একাধিক স্বজনের নামে ব্যাংক হিসাব, সঞ্চয়পত্র ও বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে।

এ ঘটনায় দুদকের উপপরিচালক শেখ গোলাম মাওলা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় কাজী আবু মাহমুদ ফয়সালসহ পরিবারের একাধিক সদস্যকে আসামি করা হয়েছে।

দুদক জানিয়েছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজস্ব প্রশাসনের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ দেশের কর ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তারা বলছেন, কর প্রশাসনে দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি ও সম্পদের নিয়মিত অডিট নিশ্চিত করা জরুরি।

এখন দুদকের তদন্তে অভিযোগগুলোর কতটা সত্যতা প্রমাণিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে কী ধরনের আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়— সেদিকেই নজর রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলের।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ