বৃহস্পতিবার, মে ২১, ২০২৬

গণপূর্তের ই/এম বিভাগে দু’র্নী’তির বিস্তর অ’ভিযোগ, নির্বাহী প্রকৌশলী আবু তালেবকে ঘিরে তোলপাড়

সরকারি চাকরিতে নিয়োগ জালিয়াতি থেকে শুরু করে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ—গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম বিভাগ-৮ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু তালেবের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগে নতুন করে আলোচনায় এসেছে সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়া এক অভিযোগপত্রে তার বিরুদ্ধে বিসিএস ক্যাডার না হয়েও অবৈধভাবে ক্যাডার পরিচয়ে চাকরি গ্রহণ, জ্যেষ্ঠতা জালিয়াতি এবং কাজ না করেই কোটি কোটি টাকার বিল উত্তোলনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিভিন্ন উন্নয়ন ও মেরামত প্রকল্পে কোনো কাজ সম্পন্ন না করেই অন্তত ৫ কোটি ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকল্পের প্রাক্কলন অনুমোদনের আগেই ১০ শতাংশ কমিশন নিশ্চিত করা হতো এবং নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের বাইরে কাউকে কাজ দেওয়া হতো না।

দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, মো. আবু তালেব রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়েও ক্যাডার পদে নিয়োগ পান। পরে জালিয়াতির মাধ্যমে ২৭তম বিসিএস কর্মকর্তাদের টপকে জ্যেষ্ঠতা অর্জন করে দ্রুত নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি নেন। বিষয়টিকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইতিহাসে নজিরবিহীন অনিয়ম হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ ১৬টি প্রতিষ্ঠানের মেরামত কাজ কাগজে-কলমে সম্পন্ন দেখিয়ে পুরো বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। যদিও সরেজমিনে গিয়ে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে তেমন কোনো কাজের বাস্তব চিত্র পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, কাজ শেষ হয়েছে দেখাতে ব্যাকডেটেড ভুয়া প্রত্যয়নপত্র তৈরি এবং নথিপত্রে কারসাজির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রভাবিত করে দীর্ঘদিন ধরে এসব অনিয়ম চালিয়ে আসছিলেন তিনি। কোনো ঠিকাদার আপত্তি জানালে তাকে কাজ থেকে বাদ দেওয়ার হুমকি দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।

প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার আমিনুল ইসলাম অভিযোগ করেন, আবু তালেবের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যেখানে কমিশন ছাড়া কোনো কাজ পাওয়া যায় না। তার দাবি, এ ধরনের দুর্নীতির কারণে সৎ ঠিকাদাররা ব্যবসা থেকে ছিটকে পড়ছেন এবং রাষ্ট্রের শত কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।

এদিকে গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে অভিযোগ উঠেছে, সরকারি চাকরির আয়ের তুলনায় কয়েকশ গুণ বেশি সম্পদের মালিক হয়েছেন আবু তালেব। ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় তার নামে-বেনামে একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট ও বিপুল সম্পদের তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগ আমলে নিয়ে ইতোমধ্যে নথিপত্র যাচাই শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। অভিযোগকারী আবু তালেবকে সাময়িক বরখাস্ত, দ্রুত তদন্ত এবং দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

তবে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত মো. আবু তালেবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বিষয়টি নিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি অব্যাহত থাকলে সরকারি প্রকল্পের মান, সময়মতো কাজ সম্পন্ন হওয়া এবং জনসেবার ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তারা টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়াতে ই-টেন্ডারিং, থার্ড পার্টি মনিটরিং এবং ডিজিটাল ডকুমেন্টেশন আরও জোরদারের পরামর্শ দিয়েছেন।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ