বৃহস্পতিবার, মে ৭, ২০২৬

যে মামলায় আলোচিত সাবেক লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ৫ দিনের রিমান্ডে

যে মামলায় আলোচিত সাবেক লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ৫ দিনের রিমান্ডে

‎এসিএম নিউজ, ঢাকা‎

ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে রাজধানীর পল্টন থানায় দায়ের করা মানব পাচার আইনের একটি মামলায় দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। আজ মঙ্গলবার ঢাকার মেট্রোপলিটন আমিনুল ইসলাম জুনাইদ তাঁকে রিমান্ডে দেওয়ার নির্দেশ দেন।
বিকাল পাঁচটার দিকে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে আদালতে হাজির করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি’র এসআই রায়হানুর রহমান ৫ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। মাসুদ উদ্দিনের পক্ষে তার আইনজীবী রিমান্ড বাতিলের আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষে মহানগর দায়রা আদালতের পিপি ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন। শুনানি শেষে আদালত ৫ দিনই রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
গতকাল সোমবার গভীর রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার ২ নম্বর লেনের ১৫৩ নম্বর বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে মানবপাচার মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে আদালতে হাজির করা হয়।

মামলা সূত্রে জানা গেছে, রিক্রুটিং এজেন্সি আফিয়া ওভারসিজের স্বত্বাধিকারী আলতাব খান ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পল্টন মডেল থানায় সাবেক প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ইমরান আহমেদ, সচিব আহমেদ মুনিরুস সালেহীন, সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, তার স্ত্রী কাশ্মীরি কামাল, মেয়ে নাফিসা কামাল, সাবেক এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারী, সাবেক এমপি লে. জে. (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও বেনজির আহমেদ সহ ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে একটি মানব পাচার মামলা দায়ের করেন। মামলায় তাদের বিরুদ্ধে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ২৪ হাজার কোটি টাকা পাচার ও আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়।
মামলার বাদী আলতাব খান অভিযোগে বলেন, মালয়েশিয়ায় অনেক বাংলাদেশি কর্মীকে শোষিত, আটক, বেকার করা হয়েছিল এবং তাদের পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছিল-এগুলো সবই মানব পাচারের লক্ষণ। আফিয়া ওভারসিজসহ বাংলাদেশের অনেক রিক্রুটিং এজেন্সিও বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায়কারী সিন্ডিকেটের কারণে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
মামলায় আরো অভিযোগ করা হয়, আসামিরা পরস্পরযোগ সাজসে বিপুল পরিমাণ অর্থ চাঁদা হিসেবে নিয়েছেন।
‎মামলাটি তদন্তের পর গতবছর সিআইডির হিনিয়াস ক্রাইম বিভাগের পুলিশ পরিদর্শক মো. রাসেল মামলাটি মিথ্যা বলে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ সব আসামির অব্যাহতি চেয়ে আদালতে আবেদন করেন। এছাড়াও মিথ্যা মামলা করায় বাদীর বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ২১১ ধারায় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির মো. রাসেল চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলেন, মামলার বাদী সরাসরি ভুক্তভোগী নন। এই মামলায় ভিকটিমরা হলেন শ্রমিক। মালয়েশিয়ায় ৪ লাখ ৭৬ হাজার শ্রমিক যারা গিয়েছিলেন, তাদের কেউই মামলার বাদীকে টাকা দেননি। ভিকটিমরা ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সির কাছে না গিয়ে অন্তত ৩ হাজার এজেন্সির কাছে টাকা দিয়েছিলেন। তাদের কেউ ৪ লাখ টাকা, কেউ সাড়ে ৪ লাখ টাকা, আবার কেউ-বা ৫ লাখ টাকা দিয়ে থাকলেও তারা প্রত্যেকে ৭৮ হাজার টাকা প্রদানের নথিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। যদি তারা বেশি অর্থ প্রদান করেন, তাহলে তাদের নিজেদেরকেই অভিযোগ দায়ের করতে হবে। এখন পর্যন্ত এক জন ভুক্তভোগীও অভিযোগ করেননি। মামলায় যথাযথ প্রমাণের অভাব রয়েছে।
‎‎পরবর্তীতে বাদী পুলিশ প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে না- রাজী দাখিল করলে আদালতের ফের মামলাটি তদন্তে পাঠায়। মামলাটি বর্তমানে ডিবিতে তদন্তাধীন রয়েছে।
রিমান্ড আবেদনে যা বলা হয়েছে:
রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, মামলার তদন্তকালে এজাহারনামীয় ৩ নম্বর আসামি মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ঘটনার পর থেকে পলাতক ছিলেন। ডিএমপির চৌকস টিম তার অবস্থান নির্ণয় করে নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। এরপর তাকে মামলার বিষয়ে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি নিজেকে আড়াল করে মামলার বিষয়ে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। এমতাবস্থায় মামলার মূল রহস্য উদঘাটন, পলাতক আসামি গ্রেপ্তার, আত্মসাৎ করা টাকা উদ্ধার, চাঁদার টাকা উদ্ধার , মূল অপরাধী চক্র সনাক্তসহ অন্যান্য আসামিকে গ্রেপ্তারের জন্য তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে। এ জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড প্রয়োজন।

আদালতে শুনানি:
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, এই মামলার মূল রহস্য উদঘাটন জরুরি। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে মূল রহস্য উৎঘাটিত হবে। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে। এক পর্যায়ে তিনি বলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে একসময় যাকে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছিল, তিনি বর্তমানে দেশের প্রধানমন্ত্রী।

২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। একই বছর এক-এগারোর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। জরুরি অবস্থার ওই সময়ে পেছন থেকে জেনারেল মাসুদই যৌথ বাহিনীর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতেন বলে ধারণা করা হতো।
সেনা কর্মকর্তাদের নেতৃত্বাধীন ওই বাহিনী শীর্ষ রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করত এবং পরে তাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা দেওয়া হতো।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বারিধারা ডিওএইচএসের থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। একই বছর এক-এগারোর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০০৮ সালের জুনে তাঁকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরও তিনি ২০১১ সালের জুন পর্যন্ত ওই দায়িত্বে বহাল ছিলেন।
২০১৮ সালে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
আদালতে পাঠানোর আগে দুপুর দুইটার সময় ডিবি পুলিশ সংবাদ সম্মেলনে জানান মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে ১১ টি মামলার খোঁজ পাওয়া গেছে। এরমধ্যে ফেনীতে তিনটি মামলা ও ঢাকায় আটটি মামলা রয়েছে।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের মার্চে দুদকের এক মামলায় আওয়ামী লীগের সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের স্ত্রী-কন্যার সঙ্গে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকেও আসামি করা হয়।
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে ‘সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায়’ করে ১ হাজার ১২৮ কোটি ৬১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ‘আত্মসাৎ ও পাচারের’ অভিযোগ আনা হয় তাদের বিরুদ্ধে।
এছাড়া ১০০ কোটি টাকা ‘পাচারের’ অভিযোগে ২০২৫ সালের আগস্টে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, তার স্ত্রী ও মেয়ের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ