বৃহস্পতিবার, মে ৭, ২০২৬

সুফল প্রকল্পে শত কোটি টাকার অ’নিয়মের অ’ভিযোগ: বন কর্মকর্তা সরওয়ার জাহানকে ঘিরে তোলপাড়

কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বাঁকখালী রেঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে “সুফল প্রকল্প” বাস্তবায়নের নামে ব্যাপক অনিয়ম, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, বনভূমি দখল এবং বনজ সম্পদ পাচারের অভিযোগ উঠেছে বন কর্মকর্তা (বর্তমানে সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত ডেপুটি রেঞ্জার) মো. সরওয়ার জাহানের বিরুদ্ধে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগে কর্মরত রয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, দীর্ঘ ২১ বছরের চাকরি জীবনে তিনি বিভিন্ন কর্মস্থলে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডার বাণিজ্য, অবৈধ বনায়ন প্রকল্প ও বনভূমি দখলের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। বন বিভাগের অভ্যন্তরে তিনি “বনদস্যু সরওয়ার” নামে পরিচিত বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সুফল প্রকল্পে অনিয়ম ও ভুয়া ভাউচারের অভিযোগ

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাঁকখালী রেঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে সুফল প্রকল্পের আওতায় বনায়নের নামে প্রায় ২৫৮০ হেক্টর বাগান সৃজনের বরাদ্দ নেওয়া হলেও বাস্তবে কাজের বড় অংশ সম্পন্ন হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার প্রকল্প ব্যয় দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পে প্রায় ১৫ কোটি টাকার যে ভাউচার দাখিল করা হয়েছে তার অনেকগুলোই ভুয়া। ভাউচারে উল্লেখিত ব্যক্তিদের অনেককেই খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন তিনি।

অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সহযোগিতায় এসব অনিয়ম দীর্ঘদিন ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে।

বনভূমি দখল ও সম্পদ পাচারের অভিযোগ

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামের পদুয়া চেকপোস্ট ও বিভিন্ন রেঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে সরওয়ার জাহানের বিরুদ্ধে বনভূমি বিক্রি, পাহাড় কাটা, মাটি ও বালু পাচার, অবৈধ ইটভাটা পরিচালনায় সহযোগিতা এবং কাঠ পাচারকারীদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া বাঘখালী রেঞ্জে বনের জমিতে অবৈধ ঘরবাড়ি নির্মাণ, তামাক ও চাষাবাদের জন্য জমি ইজারা এবং বনজ সম্পদ উজাড়ের অভিযোগও উঠেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তার সময়েই কেরানীরহাট এলাকায় অসংখ্য ইটভাটা গড়ে ওঠে, যেগুলোর জ্বালানির বড় অংশ বন থেকে অবৈধভাবে সংগ্রহ করা হতো।

অবৈধ সম্পদের পাহাড়

অভিযোগ অনুযায়ী, অবৈধ আয়ের টাকায় চট্টগ্রাম ও মিরসরাই এলাকায় সরওয়ার জাহানের একাধিক বহুতল ভবন, দোকান, বাস পরিবহনে বিনিয়োগ এবং বিলাসবহুল গাড়ি রয়েছে। এছাড়া কক্সবাজার ও উখিয়ায় জমি, বাড়ি ও হোটেল ব্যবসায় অংশীদারিত্বের তথ্যও পাওয়া গেছে।

সূত্রগুলো দাবি করেছে, তার এবং পরিবারের সদস্যদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা রয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেও আর্থিক লেনদেন পরিচালনা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাজনৈতিক প্রভাব ও তদন্ত ধামাচাপার অভিযোগ

অনুসন্ধানে জানা যায়, সাবেক এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয়ে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক পোস্টিং বাগিয়ে নেন সরওয়ার জাহান। অভিযোগ রয়েছে, টাকার বিনিময়ে বদলি ঠেকানো এবং বিভিন্ন পদে বহাল থাকার জন্য রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করা হয়েছে।

বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, তার বিরুদ্ধে অতীতে গণস্বাক্ষরসহ একাধিক অভিযোগ দাখিল হলেও সেগুলোর অনেকই তদন্ত ছাড়াই ধামাচাপা পড়ে যায়।

তবে বর্তমানে বন অধিদপ্তর, বন অঞ্চল ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তার বিরুদ্ধে দায়ের করা একাধিক অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানা গেছে।

স্টাফদের ক্ষোভ

বন বিভাগের একাধিক কর্মচারী অভিযোগ করেন, প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ, শ্রমিকদের বিল বকেয়া রাখা এবং বিভিন্ন কাজে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে অর্থ লোপাটের ঘটনায় অধীনস্থ কর্মকর্তারাও ক্ষুব্ধ। তবে দীর্ঘদিন প্রভাবশালী অবস্থানে থাকায় কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাননি।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সরওয়ার জাহানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ