
রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের মতো স্পর্শকাতর ও সংরক্ষিত এলাকায় বহিরাগত নারীকে নিয়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর অভিযোগ উঠেছে পুলিশ টেলিকমের পরিদর্শক (নিঃ) মো. রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে। অভিযোগের পর ঘটনা তদন্তে প্রাথমিকভাবে সত্যতা পাওয়ার পর তাকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে পুলিশ টেলিকমের ট্রেনিং শাখায় বদলি করা হয়েছে। তবে গুরুতর অভিযোগের পরও চাকরিচ্যুতি বা বিভাগীয় মামলা না করে শুধু বদলি করায় পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৯ জুলাই। রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের ১ নম্বর (আব্দুস সালাম) গেটে দায়িত্ব পালনকালে সকাল ৭টা ৫০ মিনিটের দিকে দ্রুত বেরিয়ে যাওয়া বোরকা পরা এক নারীকে সন্দেহ হয় কর্তব্যরত কনস্টেবল পারভেজ আলীর। তাকে থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তার বক্তব্যে অসংগতি পাওয়া যায়। পরে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়।
পরবর্তীতে এসআই (সশস্ত্র) মো. সাহাব উদ্দিনের উপস্থিতিতে জিজ্ঞাসাবাদে ওই নারী নিজের নাম মোছা. তানজিলা আক্তার আয়েশা এবং বাড়ি পটুয়াখালী বলে জানান। তার দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, আগের দিন রাত ১১টার দিকে পুলিশ টেলিকমে কর্মরত পরিদর্শক মো. রেজাউল করিম ও অপর এক এসআই তাকে ৫ হাজার টাকার বিনিময়ে রাজারবাগের নতুন ২০ তলা ভবনের সপ্তম তলায় নিয়ে যান। সেখানে রাত কাটানোর পর সকালে তাকে ৪ হাজার টাকা দিয়ে দ্রুত পুলিশ লাইন্স থেকে বের হয়ে যেতে বলা হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
ঘটনার পর ওই নারী রেজাউল করিমকে ফোনে বিষয়টি জানান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর রেজাউল করিম ১ নম্বর গেটে এসে ওই নারীকে নিজের বোন পরিচয়ে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যরা তাকে ছেড়ে না দিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে ওই নারীর লিখিত বক্তব্য গ্রহণ করেন। পরে তাকে পুলিশ লাইন্স থেকে বের করে দেওয়া হয়।
ঘটনার প্রতিবেদন, পরে বদলি
ঘটনাটির বিস্তারিত উল্লেখ করে গত ৩ আগস্ট এসআই মো. সাহাব উদ্দিন উপ-পুলিশ কমিশনার (ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড ফোর্স)-এর কাছে লিখিত প্রতিবেদন দেন। প্রতিবেদনে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও সংরক্ষিত স্থাপনার ভেতরে এ ধরনের ঘটনা বাহিনীর শৃঙ্খলা ও ভাবমূর্তির জন্য গুরুতর ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করা হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২০ আগস্ট পুলিশ টেলিকমের অ্যাডিশনাল আইজিপি মো. মনিরুজ্জামানের স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে পরিদর্শক রেজাউল করিমকে বর্তমান দায়িত্ব থেকে সরিয়ে ট্রেনিং শাখায় বদলি করা হয়।
তবে অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় কেবল দপ্তর পরিবর্তনকে যথাযথ শাস্তি হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের অনেকে। তাদের প্রশ্ন, সরকারি আবাসিক ও সংরক্ষিত এলাকায় এমন গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে কেন পূর্ণাঙ্গ বিভাগীয় তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।
বদলি বাণিজ্যেরও অভিযোগ
রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে এর আগেও অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ছিল বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর। ওসি (এমটি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের বদলি করিয়ে দেওয়ার নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ পুলিশ সদস্যদের বদলির ক্ষেত্রে জনপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা এবং জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ থেকে বদলির ক্ষেত্রে ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ নেওয়া হতো। এসব অভিযোগের বিষয়ে অবশ্য কোনো স্বাধীন তদন্তের ফলাফল বা আদালতে প্রমাণিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে সরকারি কোয়ার্টার ও যানবাহনের অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। এমটি শাখার বেতার কনস্টেবল সোহাগ তার সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
সূত্রের দাবি, কোভিড-১৯ মহামারির সময় সরকারি গাড়ি অবৈধভাবে ভাড়ায় ব্যবহার করে অর্থ উপার্জনের অভিযোগে রেজাউল করিমকে একবার সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।
‘বদলি কি শাস্তি?’
রাজারবাগের সাম্প্রতিক ঘটনার পর পুলিশ সদস্যদের একটি অংশের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগের ক্ষেত্রে শুধু এক শাখা থেকে অন্য শাখায় বদলি কি আদৌ শাস্তি হিসেবে গণ্য হতে পারে?
ক্ষুব্ধ কয়েকজন পুলিশ সদস্যের দাবি, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ও ফৌজদারি আইনে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তাদের মতে, শুধু বদলি করা হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়মের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থেকে যায়।
এদিকে রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে নারীসংক্রান্ত অভিযোগ ছাড়াও বদলি বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সরকারি সম্পদের অপব্যবহারের যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এখন রাজারবাগের ঘটনা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে আরও কঠোর বিভাগীয় বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না, সেটিই দেখার বিষয়।

