Monday, August 24, 2026

কোটি টাকার ঘু’ষ-বাণিজ্যের অভিযোগ, রাজস্ব কর্মকর্তা মাসুমের বিরুদ্ধে বিপুল অ’বৈধ সম্পদ অর্জনের তথ্য

কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর)-এর রাজস্ব কর্মকর্তা (আরও) বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমের বিরুদ্ধে অনিয়ম, ঘুষ-বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেট থেকে বদলি হয়ে ঢাকায় আসার পর জ্যেষ্ঠতা ও প্রশাসনিক নিয়ম উপেক্ষা করে প্রভাব খাটিয়ে তিনি কমিশনারেটের গুরুত্বপূর্ণ ‘হেডকোয়ার্টার রাজস্ব কর্মকর্তা’ পদে দায়িত্ব নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ওই পদে দায়িত্ব নেওয়ার পর বন্ড সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর ফাইল আটকে রাখা, অডিট কার্যক্রমে শিথিলতা, শোকজ নোটিশ প্রত্যাহার এবং বন্ড লাইসেন্সসংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতা নিরসনের নামে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। বিশেষ করে ডিপ্লোমেটিক বন্ড ওয়্যারহাউসের কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে প্রতি মাসে ২ থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত অবৈধ মাসোহারা আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, এ ধরনের অর্থ লেনদেনের কারণে একদিকে ব্যবসায়ীরা হয়রানি ও অতিরিক্ত আর্থিক চাপের মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও বন্ড সুবিধার স্বচ্ছতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

কোটি টাকার মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একটি প্রজ্ঞাপনের তথ্য উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা জানান, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর)-এ দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন বন্ড সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানের ফাইল প্রক্রিয়াকরণে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি করা হচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রশাসনিক অনুমোদন, অডিট কার্যক্রম, শোকজ নোটিশ প্রত্যাহার কিংবা বন্ড লাইসেন্সসংক্রান্ত ফাইল দীর্ঘদিন আটকে রেখে একপর্যায়ে আর্থিক সমঝোতার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়। বিশেষ করে ডিপ্লোমেটিক বন্ড ওয়্যারহাউসকে কেন্দ্র করে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হলে অর্থ লেনদেনের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

স্ত্রীর নামে বিপুল সম্পদ, নথিতে জমির পরিমাণ নিয়ে গরমিল

অভিযোগে বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমের পরিবারের নামে বিপুল সম্পদ অর্জনের তথ্যও উঠে এসেছে। বিশেষ করে তাঁর গৃহিণী স্ত্রী সানজিদা আফরিন লিপির নামে রাজধানীর ভাটারা মৌজায় জমি কেনা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভাটারা মৌজার জেএল নম্বর ১৫, নামজারি খতিয়ান নম্বর ২৯৭১৬ এবং দাগ নম্বর ২০৭৬৩-সংক্রান্ত সম্পত্তি ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৭৫৬(IX-I) নম্বর নামজারি মামলার মাধ্যমে সানজিদা আফরিন লিপির নামে হস্তান্তর করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর স্থায়ী ঠিকানা খুলনার সোনাডাঙ্গা এলাকায় বলে জানা গেছে।

তবে সংশ্লিষ্ট নথিতে জমির পরিমাণ নিয়ে অসঙ্গতির অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মূল নামজারি খতিয়ানে জমির পরিমাণ ০.৪০০০ একর বা ৪০ শতাংশ উল্লেখ থাকলেও ডিজিটাল ভূমি রেকর্ডে একই দাগে ৪.৯৬ একর জমির তথ্য দেখা যাচ্ছে।

এই পার্থক্য কীভাবে তৈরি হয়েছে এবং এর পেছনে কোনো প্রশাসনিক বা নথিগত অনিয়ম রয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগকারীদের হিসাবে, ভাটারা এলাকার বর্তমান বাজারদর বিবেচনায় ৪০ শতাংশ জমির মূল্য কয়েক কোটি থেকে কয়েক দশ কোটি টাকা হতে পারে। তবে জমির প্রকৃত বাজারমূল্য নির্ধারণ ও মালিকানার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি যাচাই ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

এ ছাড়া স্ত্রী ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নামে খুলনার সোনাডাঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকায় আরও স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ থাকার অভিযোগও উঠেছে।

রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন

কাস্টমস বন্ড ব্যবস্থা দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বন্ড সুবিধার আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো নির্দিষ্ট শর্তে শুল্ক ও কর সুবিধা পেয়ে থাকে। ফলে এ ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সংশ্লিষ্ট এক সাবেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘হেডকোয়ার্টার রাজস্ব কর্মকর্তা’ পদটি কমিশনারেটের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি। এ পদে বসে কোনো কর্মকর্তা যদি নিয়মবহির্ভূতভাবে ফাইল আটকে রাখেন বা আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগে জড়ান, তাহলে তার প্রভাব পুরো কমিশনারেটের কার্যক্রমে পড়তে পারে।

তাঁর মতে, অভিযোগগুলো সত্য হলে বিষয়টি শুধু একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এর সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার প্রশ্নও জড়িত।

তদন্তের দাবি ব্যবসায়ীদের

বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন মহল।

তাদের দাবি, অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য মাসুম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব, আয়কর নথি, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য এবং সম্পদ বিবরণী পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ডিপ্লোমেটিক বন্ড ওয়্যারহাউস-সংক্রান্ত ফাইল, লেনদেনের নথি এবং তাঁর স্বাক্ষরিত ফাইল নোটিংও পরীক্ষা করার দাবি জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া বন্ড সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ এবং অভিযোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাইয়ের আহ্বান জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

দুদকের তদন্তের দাবি

অভিযোগকারীরা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, একজন সরকারি কর্মকর্তার বৈধ আয় ও ঘোষিত সম্পদের সঙ্গে তাঁর পরিবারের নামে থাকা সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।

তারা আরও বলেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে সেটিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

তবে বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর স্বাধীন ও নিরপেক্ষ যাচাইও প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত বা তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা সংযুক্ত করা হবে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ