Monday, August 24, 2026

বিএডিসির জীবপ্রযুক্তি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ, ডোমার ল্যাবে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ও ভু’য়া বিলের অভিযোগ

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ‘জীবপ্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষিবীজ উন্নয়ন ও বর্ধিতকরণ প্রকল্প’-এর আওতায় নীলফামারীর ডোমার ভিত্তি বীজ আলু উৎপাদন খামারের টিস্যু কালচার গবেষণাগার উন্নয়ন ও যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্প পরিচালক (পিডি) কৃষিবিদ ড. এ. বি. এম. গোলাম মনসুরের বিরুদ্ধে নিম্নমানের ও অননুমোদিত যন্ত্রপাতি ক্রয়, ভুয়া বিল-ভাউচার, সরকারি অর্থ অপচয় এবং নিয়োগ-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগ রয়েছে, কৃষিবীজের উন্নয়ন ও বর্ধিতকরণের মাধ্যমে কৃষি খাতকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে নেওয়া প্রকল্পটির আওতায় ডোমার খামারের টিস্যু কালচার ল্যাব আধুনিকায়নে বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও প্রকল্পের নির্ধারিত বৈজ্ঞানিক মান ও কারিগরি স্পেসিফিকেশন অনুসরণ করা হয়নি। এর পরিবর্তে নিম্নমানের, অননুমোদিত ও রিকন্ডিশন্ড যন্ত্রপাতি সরবরাহের মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয় করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ডোমার ল্যাবের জন্য অটোক্লেভ মেশিন, ল্যামিনার এয়ার ফ্লো হুড, টিস্যু কালচার গ্রোথ চেম্বার, সেন্ট্রিফিউজ ও ইনকিউবেটরসহ বিভিন্ন উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতি কেনার কথা ছিল। এসব যন্ত্রপাতি নির্ধারিত বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড মেনে সংগ্রহ করার কথা থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিম্নমানের ও রিকন্ডিশন্ড সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ল্যাবের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে বিশেষায়িত এইচভিএসি (HVAC) ব্যবস্থা স্থাপনের কথা থাকলেও সেখানে সাধারণ মানের এসি ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতি সরবরাহ না করেও ভুয়া প্রাক্কলন ও ডেলিভারি চালানের মাধ্যমে বিল উত্তোলন করা হয়েছে।

ল্যাবের উৎপাদন নিয়েও প্রশ্ন

অভিযোগকারীদের দাবি, ডোমারের টিস্যু কালচার ল্যাবে আলু, কলা, আনারস ও সৌদি খেজুরের চারা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা কাগজে-কলমে বড় করে দেখানো হলেও বাস্তবে উৎপাদনের মান ও পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ল্যাবের পরিবেশ যথাযথভাবে জীবাণুমুক্ত না থাকায় উৎপাদিত চারা ও বীজের একটি বড় অংশ ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের সংক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

একই সঙ্গে রাসায়নিক উপকরণ, কালচার মিডিয়াম ও ল্যাবরেটরি রক্ষণাবেক্ষণের নামে নিয়মিত বড় অঙ্কের বিল-ভাউচার অনুমোদনের অভিযোগও উঠেছে। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ

মাঠপর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রকল্পের অনিয়মের বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হলে কর্মকর্তাদের বদলি কিংবা ওএসডি করার ভয় দেখানো হয়। তাদের দাবি, অনিয়মের কারণে ডোমার ল্যাবের কার্যক্রম প্রত্যাশিতভাবে এগোচ্ছে না।

এ ছাড়া বিভিন্ন কৃষক প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজনেও প্রকৃত কার্যক্রমের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যয় দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রকল্পটির অর্থ ব্যবস্থাপনা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক ড. এ. বি. এম. গোলাম মনসুরের বক্তব্য জানতে তার কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তিনি কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

তদন্তের উদ্যোগ

বিএডিসির একটি সূত্র জানিয়েছে, ডোমার খামারে যন্ত্রপাতি ক্রয়সহ প্রকল্পের বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয় ও বিএডিসির ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানা গেছে। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে প্রকল্প পরিচালককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে সূত্রটি দাবি করেছে।

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব সেলিম খান বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত অবগত নন। তিনি সম্প্রতি দায়িত্ব নিয়েছেন এবং অভিযোগের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

কৃষি খাতের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পে সরকারি অর্থের অপচয় ও অনিয়মের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, প্রকল্পের অর্থ ব্যয়, যন্ত্রপাতি ক্রয়, সরবরাহের মান, বিল-ভাউচার এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ