
ঢাকা ওয়াসার সুপেয় পানির বিশেষ প্রকল্প ‘ওয়াটার এটিএম’ পরিচালনা ও চুক্তি নবায়নকে ঘিরে গুরুতর অনিয়ম, স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, উন্মুক্ত দরপত্র (ওটিএম) কিংবা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘ড্রিঙ্কওয়েল’ (উইস্ট বাংলাদেশ লিমিটেড)-এর সঙ্গে আবারও চুক্তি নবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গত ২৯ জুন ড্রিঙ্কওয়েলের পক্ষ থেকে আরও পাঁচ বছরের জন্য চুক্তি নবায়নের আবেদন ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কোনো উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি বহাল রাখার জন্য পর্দার আড়ালে তৎপরতা চলছে।
বিনা পুঁজিতে শতকোটি টাকার ব্যবসার অভিযোগ
অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে, গত প্রায় নয় বছরে ওয়াটার এটিএম প্রকল্পের মাধ্যমে ড্রিঙ্কওয়েল কোনো উল্লেখযোগ্য নিজস্ব বিনিয়োগ ছাড়াই বিপুল অর্থ আয় করেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওয়াটার এটিএম বুথের অবকাঠামো নির্মাণে ঢাকা ওয়াসা প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। অন্যদিকে, ২৯৪টি বুথ থেকে পানি বিক্রির আয় থেকে ড্রিঙ্কওয়েল প্রায় ১৪০ কোটি টাকা পেয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
সূত্রগুলোর হিসাবে, প্রকল্পটির অবকাঠামোগত ব্যয় ও আয়-বণ্টনের কাঠামোর কারণে ঢাকা ওয়াসার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তবে এসব হিসাবের বিষয়ে ঢাকা ওয়াসার কোনো আনুষ্ঠানিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন বা কর্তৃপক্ষের প্রকাশ্য বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া ঢাকা ওয়াসা ভবনে ড্রিঙ্কওয়েলের ব্যবহৃত অফিসের বাজারমূল্য অনুযায়ী মাসিক ভাড়া প্রায় ৫ লাখ টাকা হতে পারে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। সেই হিসাবে প্রায় নয় বছরে অফিস ভাড়া বাবদও ওয়াসা উল্লেখযোগ্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রকল্পের পুরো অবকাঠামো ওয়াসার, আয় নিয়ে প্রশ্ন
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওয়াটার এটিএম প্রকল্পের অধিকাংশ অবকাঠামো ও বিনিয়োগ করেছে ঢাকা ওয়াসা। চুক্তির কাঠামো অনুযায়ী, ওয়াসা বুথের ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ করে এবং ড্রিঙ্কওয়েল অটোমেশন, পানি পরিশোধন প্রযুক্তি, স্মার্ট কার্ড ও পরিচালন কার্যক্রমের দায়িত্ব পালন করে।
বুথ থেকে অর্জিত আয় নির্ধারিত কাঠামো অনুযায়ী দুই পক্ষের মধ্যে ভাগ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে প্রকল্পটি ওয়াসার জন্য কতটা লাভজনক হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ঢাকা ওয়াসার অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে প্রকল্পটির আর্থিক কার্যকারিতা ও লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। একই সঙ্গে পিপিপি প্রকল্পের ক্ষেত্রে বাজারদর যাচাই, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা এবং বিকল্প প্রযুক্তি মূল্যায়নের মতো বিষয়গুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
তাকসিম এ. খানের সময়ের চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা ওয়াসার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ. খানের দায়িত্ব পালনকালে ড্রিঙ্কওয়েল ওয়াটার এটিএম ব্যবসায় বিশেষ সুবিধা পেয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাকসিম এ. খান পদত্যাগ করলেও তার সময়ের এই চুক্তি এখনো বহাল রয়েছে বলে সূত্রগুলো দাবি করেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, তাকসিম এ. খানের সময়কার প্রভাববলয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা এখনো ড্রিঙ্কওয়েলকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এমনকি প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়মিত সুবিধা পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো নথি পাওয়া যায়নি।
ওয়াসার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রকল্পটি শুরু থেকেই একটি বিশেষ প্রভাববলয়ের মধ্যে ছিল বলে তাদের ধারণা। তার দাবি, এখানে নিয়ম-কানুনের চেয়ে একটি নির্দিষ্ট পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
নতুন মডেল নিয়েও বিতর্ক
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ড্রিঙ্কওয়েলকে পুনরায় সুবিধা দিতে সম্প্রতি নতুন একটি ওয়াটার এটিএম মডেলের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত মডেলে বুথ নির্মাণের পুরো ব্যয় বহন করবে ঢাকা ওয়াসা। অর্থাৎ অবকাঠামো নির্মাণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ থাকবে, আর ড্রিঙ্কওয়েল পরিচালন কার্যক্রমের মাধ্যমে আয় করবে।
প্রকল্পটি অতীতে আর্থিকভাবে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি বলে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও একই প্রতিষ্ঠানকে আবারও সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ কেন নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে ওয়াসার ভেতরেই মতবিরোধ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
একটি পক্ষ উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নতুন করে প্রকল্প পরিচালনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের দাবি, ড্রিঙ্কওয়েলের পাশাপাশি দেশীয় দক্ষ প্রতিষ্ঠান ও বিকল্প প্রযুক্তিকেও প্রতিযোগিতার সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে গত কয়েক বছরের আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ অডিট করে প্রকল্পটির আর্থিক ক্ষতি ও অনিয়মের কারণ চিহ্নিত করার কথাও বলা হচ্ছে।
কর্মীদের বেতন নিয়েও অভিযোগ
এদিকে ওয়াটার এটিএম প্রকল্পে কর্মরত ড্রিঙ্কওয়েলের কর্মীদের বেতন-ভাতা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বেতন ও বোনাস পরিশোধের দাবিতে কর্মীরা ঈদের আগে ঢাকা ওয়াসা ভবনের সামনে মানববন্ধনও করেছিলেন।
সব মিলিয়ে ওয়াটার এটিএম প্রকল্পের চুক্তি নবায়ন, বিনিয়োগের কাঠামো, আয়-বণ্টন এবং গত কয়েক বছরের আর্থিক ফলাফল নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের দাবি, রাষ্ট্রীয় অর্থে নির্মিত অবকাঠামো ব্যবহার করে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা দেওয়ার পরিবর্তে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় প্রকল্প পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

