Wednesday, August 26, 2026

দু’র্নী’তির অভিযোগে তদন্তের নির্দেশ, এক বছরেও অজানা মোর্শেদ আলমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলা পরিষদে কর্মরত সাঁটমুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. মোর্শেদ আলমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অবৈধ অর্থ লেনদেন ও সরকারি তথ্য পাচারের অভিযোগ ওঠার পর তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হলেও সেই তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার শাখা থেকে অভিযোগগুলো তদন্ত করে মতামতসহ প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য ২০২৫ সালের ২৩ জুন আদর্শ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে লিখিত নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে কি না, হয়ে থাকলে ফলাফল কী এবং কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না—তা এখনো স্পষ্ট নয়।

প্রশাসনিক নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল তোফায়েল ও মো. রফিকুল ইসলাম নামে দুই ব্যক্তি কুমিল্লা বিভাগীয় কমিশনারের কাছে মোর্শেদ আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে তাঁরা তাঁকে অন্যত্র বদলিরও আবেদন জানান।

পরবর্তীতে ১৯ মে ২০২৫ তারিখের একটি স্মারকের মাধ্যমে অভিযোগটি কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়। এরপর জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার শাখা থেকে ২৩ জুন আদর্শ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অভিযোগগুলো তদন্ত করে মতামতসহ প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই চিঠির স্মারক নম্বর ০৫.২০.১৯০০.০০৯.৩৯.০৮.২৫.৫৯১।

তবে নির্দেশ জারির পর তদন্ত কার্যক্রম কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, তা নিয়ে কোনো পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে কি না, তদন্তে মোর্শেদ আলমের বক্তব্য নেওয়া হয়েছিল কি না এবং অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না—এসব বিষয়ও অজানা।

এদিকে মোর্শেদ আলমের সম্পদসংক্রান্ত তথ্য অনুসন্ধানে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের বজ্রপুর মৌজায় প্রায় ১০ শতাংশ জমি ও পুরোনো স্থাপনা নিয়ে একটি যৌথ মালিকানাধীন সম্পত্তির তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২২ সালের ২৮ নভেম্বর কুমিল্লা সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধিত সাফ কবলা দলিলে তাঁর নাম রয়েছে।

দলিল অনুযায়ী, ওই সম্পত্তির মোট মূল্য দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে জমির মূল্য ১ কোটি ৬৫ লাখ এবং পুরোনো স্থাপনার মূল্য ১০ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে সম্পত্তিটির মোট মূল্য ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা হওয়াকে মোর্শেদ আলমের ব্যক্তিগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, তিনি সম্পত্তিটির যৌথ মালিকদের একজন। ফলে তাঁর প্রকৃত মালিকানা বা আর্থিক অংশ কত এবং ওই অংশের মূল্য পরিশোধে অর্থের উৎস কী ছিল—এ দুটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

দলিলে সম্পত্তিটির আগের মালিকানার ইতিহাসও উল্লেখ রয়েছে। সেখানে ১৯৭৬ সালের একটি সাফ কবলা দলিল এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৯১ ও ২০১৭ সালের আপোষ বণ্টননামার মাধ্যমে মালিকানা ও অংশ নির্ধারণের তথ্য পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে নামজারি ও জমা খারিজের তথ্যও রয়েছে।

এ কারণে শুধু সম্পত্তিটির মোট মূল্য বিবেচনা না করে ২০২২ সালে সম্পত্তি ক্রয়ের সময় মোর্শেদ আলমের প্রকৃত অংশ কত ছিল এবং সেই অংশের মূল্য কীভাবে পরিশোধ করা হয়েছিল, তা নথিপত্রের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষ করে তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ থাকায় সম্পত্তি কেনার অর্থের উৎস নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ ক্ষেত্রে তাঁর বৈধ আয়, ব্যাংক হিসাব ও লেনদেন, আয়কর রিটার্ন, সরকারি চাকরিতে দাখিল করা সম্পদ বিবরণী এবং সম্পত্তি কেনার অর্থ পরিশোধসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সম্পত্তিতে তাঁর প্রকৃত মালিকানা ও আর্থিক অংশও নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

পুরো ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন ২০২৫ সালের ২৩ জুন জেলা প্রশাসনের তদন্ত নির্দেশকে ঘিরে। নির্দেশের পর তদন্ত আদৌ শুরু বা শেষ হয়েছে কি না, তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগগুলোর বিষয়ে কী বলা হয়েছে এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না—তা প্রকাশ করা প্রয়োজন।

আর যদি তদন্ত এখনো শেষ না হয়ে থাকে, তাহলে জেলা প্রশাসনের লিখিত নির্দেশের পরও কেন এতদিনে তদন্ত সম্পন্ন হয়নি, সেটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যার দাবি রাখে।

এ অবস্থায় অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে জেলা প্রশাসনের নির্দেশিত তদন্তের বর্তমান অবস্থা প্রকাশ এবং প্রয়োজন হলে নথিভিত্তিক নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে আনার দাবি উঠেছে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ