বৃহস্পতিবার, জুন ১৮, ২০২৬

কুতুবউদ্দিন আহমেদের বি’রু’দ্ধে দুদকের অনুসন্ধান বন্ধ, ধা’মা’চা’পা’র অ’ভিযোগ

একসময়ের ব্যাংক কর্মকর্তা থেকে দেশের শীর্ষ শিল্পোদ্যোক্তাদের একজন হিসেবে পরিচিত এনভয় টেক্সটাইল ও শেলটেক গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা কুতুবউদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও কালোটাকা সাদা করার অভিযোগে শুরু হওয়া দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান রহস্যজনকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ, সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা এবং একটি স্বার্থান্বেষী চক্রের যোগসাজশে বহুল আলোচিত এ অনুসন্ধান প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন, হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচার এবং আবাসন ব্যবসার আড়ালে কালোটাকা বৈধ করার অভিযোগে কুতুবউদ্দিন আহমেদ, তাঁর স্ত্রী রাশিদা আহমেদ, ছেলে তানভীর আহমেদ ও মেয়ে সুমাইয়ার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছিল দুদক। বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় কমিশনের সদর দপ্তর থেকে একজন সহকারী পরিচালককে অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

সূত্রগুলো বলছে, অনুসন্ধানের প্রাথমিক পর্যায়ে অভিযোগের পক্ষে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও নথিপত্র সংগ্রহ করা হলেও পরবর্তীতে তদন্ত কার্যক্রমের গতি হঠাৎ শ্লথ হয়ে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, দুদকের সাবেক চেয়ারম্যানের দায়িত্বকালেই একটি প্রভাবশালী মহলের প্রভাবে অনুসন্ধানটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

আর্থিক উত্থান নিয়ে প্রশ্ন

অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, কুতুবউদ্দিন আহমেদের মালিকানাধীন শেলটেক, এনভয় টেক্সটাইল, সিরামিক, আবাসনসহ ৩০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক উত্থান ও সম্পদ সঞ্চয়ের উৎস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন রয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, শেলটেকের আবাসন প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের অসাধু কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা হতো। বিশেষ করে রাজধানীর অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট বিক্রির ক্ষেত্রে প্রকৃত লেনদেনমূল্যের চেয়ে কম মূল্য দলিলে প্রদর্শনের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অঘোষিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতাদের প্রকৃত বিনিয়োগ গোপন রেখে কর নথিতে কম মূল্য প্রদর্শনের কৌশলও শেখানো হতো। এর ফলে বিপুল পরিমাণ অপ্রদর্শিত অর্থ কার্যত বৈধ করার সুযোগ পেতেন সংশ্লিষ্টরা।

বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, দেশীয় আবাসন খাতের পাশাপাশি বিদেশেও বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগ রয়েছে কুতুবউদ্দিন আহমেদ ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট নথিতে দুবাই ও পর্তুগালে ব্যাংক হিসাব, বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন সম্পদের তথ্য উল্লেখ ছিল বলে জানা গেছে।

সূত্রগুলোর দাবি, দুবাইয়ে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের ভিত্তিতে তিনি ‘গোল্ডেন ভিসা’ সুবিধাও গ্রহণ করেছেন। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে দুদক বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে তাঁর এবং পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাবসংক্রান্ত তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছিল বলেও জানা গেছে।

অনুসন্ধান বন্ধ নিয়ে বিতর্ক

দুদকের একটি সূত্র জানিয়েছে, অনুসন্ধানের প্রাথমিক পর্যায়ে সংগৃহীত তথ্য ও আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত নথি গভীর তদন্তের যথেষ্ট ভিত্তি তৈরি করেছিল। তবে পরবর্তীতে অজ্ঞাত কারণে অনুসন্ধানটি আর এগোয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শেলটেক গ্রুপের জনসংযোগ কর্মকর্তা তানিম বলেন, “অভিযোগটি একজন মৃত ব্যক্তি দায়ের করেছিলেন। সে কারণে বিধি অনুযায়ী অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।”

তবে দুদকের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর দাবি, অনুসন্ধান কার্যক্রমে যেসব তথ্য ও নথি উঠে এসেছিল, তা পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হলে দেশের আবাসন খাতের অন্যতম আলোচিত আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ পাচারের চিত্র সামনে আসতে পারত।

পুনঃতদন্তের দাবি

এদিকে, অনুসন্ধান বন্ধ হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দুর্নীতিবিরোধী বিভিন্ন সংগঠন ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। তাদের দাবি, কুতুবউদ্দিন আহমেদ ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো পুনরায় একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও পেশাদার তদন্ত টিমের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত।

একই সঙ্গে, পূর্বের অনুসন্ধানটি কী কারণে বন্ধ করা হয়েছিল, কারা এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং কোনো ধরনের অনিয়ম বা প্রভাব খাটানো হয়েছিল কি না—সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ