বৃহস্পতিবার, জুন ১৮, ২০২৬

বাজেটে শিক্ষা খাতে ১.৩৬ লাখ কোটি টাকা, গুরুত্ব স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতে

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা বেশি বরাদ্দের এ প্রস্তাবকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন শিক্ষাবিদরা। তবে তাঁদের মতে, বরাদ্দ বৃদ্ধির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে সেই অর্থের কার্যকর ব্যবহার, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেন। প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতে মোট ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ২ শতাংশ।

অন্যদিকে চলতি অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ। ফলে নতুন বাজেটে এ খাতে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রস্তাব এসেছে।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী জানান, সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষা খাতের উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিকে স্বাগত জানিয়ে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি অবশ্যই ইতিবাচক। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না।

তিনি বলেন, অতীতে শিক্ষা খাতের বিভিন্ন প্রকল্প, বিশেষ করে প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন কার্যক্রমে অনিয়ম এবং অর্থ অপচয়ের অভিযোগ উঠেছে। তাই আর্থিক শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে বাড়তি বরাদ্দের সুফল পাওয়া কঠিন হবে।

রাশেদা কে চৌধূরীর মতে, বাজেটে শিক্ষা উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বলা হলেও গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণের বিষয়ে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অথচ কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ, বাস্তবায়ন এবং ফলাফল মূল্যায়নের জন্য গবেষণায় বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রস্তাবিত বাজেটে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা—এই তিন প্রধান বিভাগের জন্য মোট ১ লাখ ২২ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর মধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪৬ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের জন্য ৫৭ হাজার ৩০১ কোটি টাকা এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের জন্য ১৮ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া বাকি অর্থ স্বাস্থ্য শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই তিন বিভাগে মোট বরাদ্দ ছিল ৮৫ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা।

শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এ বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে তবেই শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে এর বাস্তব প্রভাব দৃশ্যমান হবে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দের প্রবণতা নিম্নমুখী ছিল। এবার বরাদ্দ বৃদ্ধি শিক্ষা খাতের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।

তবে তিনি মনে করেন, মূল চ্যালেঞ্জ হলো বরাদ্দকৃত অর্থের ব্যবহারে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

ড. মনজুর আহমদ আরও বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, ক্রীড়া ও সংস্কৃতির বিকাশ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং পাঠ্যক্রম সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে বরাদ্দের অর্থ কতটা কার্যকরভাবে ব্যয় হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. আজম খান বলেন, সরকারের প্রথম বাজেটেই শিক্ষা খাতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রস্তাব এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

তিনি বলেন, শুধু বক্তব্য বা প্রতিশ্রুতি দিয়ে শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং কার্যকর বাস্তবায়ন। সরকার এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং পরিকল্পিত ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ