
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)-এর পরিচালক (বাণিজ্য) এস এম আশিকুজ্জামানকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ বাণিজ্য, আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা চলছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একাধিক অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সংগ্রহ করেছে।
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগপত্র ও বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আশিকুজ্জামানের বিরুদ্ধে বিআইডব্লিউটিসির সম্পত্তি ও জমি ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, করপোরেশনের মূল্যবান জমি ও সম্পদের ব্যবস্থাপনায় নানা অসঙ্গতি দেখা গেছে এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মহলের স্বার্থ রক্ষার অভিযোগও উঠেছে। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ অসন্তোষ প্রকাশ করে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ এবং স্মারকলিপি প্রদান করেছে বলে জানা গেছে।
পদোন্নতি নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগে বলা হয়েছে, আশিকুজ্জামান এজিএম (ফিডার) পদে প্রয়োজনীয় সময় পূর্ণ হওয়ার আগেই ২০১৫ সালে ডিজিএম (সাময়িক) পদে পদোন্নতি লাভ করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, বিআইডব্লিউটিসির বিদ্যমান কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রবিধানমালায় এ ধরনের সাময়িক পদোন্নতির কোনো বিধান নেই।
এছাড়া ডিজিএম পদে তিন বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পান বলেও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এসব পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রভাব ও অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার বলয় ভূমিকা রেখেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
২০১৮ সালে পরিচালক (বাণিজ্য) পদে পদোন্নতির পর তাঁর প্রভাব আরও বৃদ্ধি পায় বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই সময় থেকে করপোরেশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠে, যার অন্যতম কেন্দ্রীয় ব্যক্তি ছিলেন আশিকুজ্জামান।
নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ
আশিকুজ্জামানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো নিয়োগ বাণিজ্য। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ৬০০ অস্থায়ী জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাপক আর্থিক লেনদেন হয়েছে এবং নিয়োগপ্রাপ্তদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বয়সসীমা ও যোগ্যতার শর্ত উপেক্ষা করে কয়েকজনকে চাকরি দেওয়া হয়। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে দুদক ২০১৮ সালের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগসংক্রান্ত ছাড়পত্র, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, সভার কার্যবিবরণী, নোটশিট এবং নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথি তলব করেছে।
জাহাজ মেরামত ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ
করপোরেশনের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন জাহাজ মেরামত ও সংস্কারকাজ নিয়মিত দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সম্পন্ন করা হয়েছে।
বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের হাতিয়া থেকে ভাসানচরে পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত এসটি জব্বার জাহাজ মেরামতের ক্ষেত্রে টেন্ডার ও ওয়ার্ক অর্ডার ছাড়াই কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে এমভি আইভি রহমান জাহাজের মেরামত কার্যক্রম নিয়েও।
অভিযোগকারীদের মতে, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই এসব কাজ সম্পন্ন করায় রাষ্ট্রীয় অর্থ সাশ্রয়ের সুযোগ নষ্ট হয়েছে এবং নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে।
ইজারা ও টিকিটিং ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ
পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে লুজ যাত্রী পারাপারের টিকিটিং ও ইজারা কার্যক্রম নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বাজারদরের তুলনায় অনেক কম মূল্যে ইজারা প্রদান করা হয়েছে, যার ফলে সরকার উল্লেখযোগ্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
এ বিষয়ে দুদক সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংগ্রহ করেছে এবং ইজারা কার্যক্রম বিধি অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছিল কি না, তা যাচাই করছে বলে জানা গেছে।
জাহাজ নির্মাণ প্রকল্পে প্রশ্ন
এমভি বঙ্গমাতা ও এমভি বঙ্গতরী নামের দুটি জাহাজ নির্মাণ প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রকল্প দুটিতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হলেও প্রত্যাশিত ফলাফল পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপে অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার ঘটনা ঘটেছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি, তবে বিষয়টি অনুসন্ধানকারী সংস্থার নজরে রয়েছে বলে জানা গেছে।
সম্পদ অনুসন্ধানে দুদক
আশিকুজ্জামানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর এবং তাঁর স্ত্রী ফারজানার নামে থাকা জমি, ফ্ল্যাট, বাড়ি, প্লট, ব্যাংক হিসাব এবং অন্যান্য সম্পদের তথ্য সংগ্রহে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিঠি পাঠিয়েছে দুদক।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠান, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ভূমি অফিস এবং রেজিস্ট্রি অফিসসহ বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে সম্পদসংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়েছে। অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রাথমিক যাচাইয়ে কিছু অসঙ্গতির তথ্য পাওয়া গেছে এবং বিষয়টি আরও গভীরভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
আশিকুজ্জামানের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে এস এম আশিকুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, জাহাজ মেরামত, ক্রয়-বিক্রয় কিংবা সংশ্লিষ্ট অনেক কাজ তাঁর দায়িত্বের আওতায় পড়ে না। তিনি অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব দুদকের ওপর ছেড়ে দেন এবং তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে মন্তব্য করেন।
তার এই বক্তব্যে অভিযোগ অস্বীকারের পাশাপাশি তদন্ত প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থার বিষয়টিও উঠে এসেছে।
তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা
বিআইডব্লিউটিসির অভ্যন্তরে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিবাদ, নিয়োগ বাণিজ্য ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ, সম্পদ অনুসন্ধান এবং দুদকের চলমান তদন্ত—সব মিলিয়ে আশিকুজ্জামানকে ঘিরে বিতর্ক এখনো অব্যাহত রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে তা শুধু একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত দায়ের প্রশ্ন নয়; বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক জবাবদিহিতা, সুশাসন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টিকেও সামনে নিয়ে আসবে।
অন্যদিকে, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়া গেলে দীর্ঘদিনের বিতর্কেরও অবসান ঘটবে। ফলে দুদকের চূড়ান্ত অনুসন্ধান প্রতিবেদন এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের দিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্টদের।

