Monday, August 10, 2026

সিএমএসডিতে বিল ছাড়ে ১৫% কমিশনের অ’ভিযোগ, অডিট কর্মকর্তার সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন

কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি) এর অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস অফিসার মো. আব্দুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে ঠিকাদার ও সরবরাহকারীদের কাছ থেকে কমিশন আদায়, বিল আটকে রাখা এবং অল্প সময়ে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন বিল ছাড়ের ক্ষেত্রে তিনি সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দাবি করেন। কমিশনের অর্থেই ঢাকাসহ গ্রামের বাড়িতে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

সম্প্রতি এসব অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ করেছেন একজন সরবরাহকারী। অভিযোগে বলা হয়েছে, কমিশন দিতে অস্বীকৃতি জানালে সরবরাহকারীদের বিল দীর্ঘদিন আটকে রাখা হয়। বিষয়টি নিয়ে সিএমএসডিতে প্রতিবাদ করেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগকারীর দাবি। বরং প্রতিবাদকারীদের বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আব্দুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও সিএমএসডিতে আব্দুর রাজ্জাকের প্রভাব এতটাই বেশি যে, তার বিরুদ্ধে কথা বলতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকেই অনাগ্রহী। কয়েকজন সরবরাহকারীও কথিত কমিশন বাণিজ্য থেকে রেহাই পেতে সম্প্রতি দুদকের দ্বারস্থ হয়েছেন বলে জানা গেছে।

দুদকে অভিযোগে বিপুল সম্পদের তথ্য

গত ২০ জুলাই মেডিকিট করপোরেশনের স্বত্বাধিকারী দুদকে একটি লিখিত অভিযোগ করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, মো. আব্দুর রাজ্জাক রাজধানীর মিরপুরে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে স্ত্রীর নামে দুটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। এ ছাড়া পূর্বাচলে তার নামে দুটি প্লট রয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, নিজের ও স্ত্রীর নামে বিভিন্ন ব্যাংকে ৩ কোটি টাকার বেশি অর্থ জমা রয়েছে। পাশাপাশি কুড়িগ্রামে তার গ্রামের বাড়িতে প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বাগানবাড়ি নির্মাণ এবং জেলা শহর ও নিজ এলাকায় প্রায় ৩০ বিঘা জমি কেনার অভিযোগও করা হয়েছে।

অভিযোগকারী আরও দাবি করেন, সম্পদ অর্জনের পাশাপাশি আব্দুর রাজ্জাক একটি নিজস্ব বলয় তৈরি করেছেন। প্রতি ঈদে তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সিএমএসডির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্তত ৫ লাখ টাকা করে নগদ অর্থ ও বিভিন্ন উপহার দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। গত রমজানের ঈদে নগদ অর্থ পেয়েছেন এমন একজন কর্মকর্তা বিষয়টি স্বীকার করেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এসব সম্পদের মালিকানা, অর্থের উৎস এবং কথিত অর্থ লেনদেনের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

বিল আটকে কমিশন দাবির অভিযোগ

অভিযোগকারীদের দাবি, আব্দুর রাজ্জাকের কথিত বিলাসী জীবনযাপনের অন্যতম উৎস হলো সিএমএসডির বিভিন্ন কেনাকাটার বিল আটকে রেখে সরবরাহকারীদের কাছ থেকে কমিশন আদায়।

অভিযোগ অনুযায়ী, পণ্য বা যন্ত্রপাতি সরবরাহের পর বিল ছাড়ের জন্য তার দপ্তরে গেলে সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারীর কাছে তিনি সরাসরি ১৫ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ দাবি করেন। এর মধ্যে ১০ শতাংশ নিজের জন্য এবং বাকি ৫ শতাংশ অন্যদের দেওয়ার কথা বলে দাবি করা হয়।

কমিশন দিতে আপত্তি জানালে বিল আটকে রাখা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, আব্দুর রাজ্জাক বিভিন্ন সময় তার প্রভাবের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, সিএমএসডি থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত তার যোগাযোগ রয়েছে এবং বিল ছাড়াতে হলে তার শর্ত মানতে হবে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেও তারা কার্যকর প্রতিকার পাননি।

৭৯ কোটি টাকার বিল নিয়ে গুরুতর অভিযোগ

অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ করে ৭৯ কোটি টাকার একটি কথিত ভুয়া বিল অনুমোদন করিয়ে সেখান থেকে আব্দুর রাজ্জাক ৬ কোটি টাকার বেশি অর্থ নিয়েছেন। ওই অর্থের একটি অংশ দিয়ে মিরপুরে ফ্ল্যাট ও পূর্বাচলে প্লট কেনা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ৭৯ কোটি টাকার কথিত ভুয়া বিল এবং সেখান থেকে কমিশন হিসেবে ৬ কোটি টাকার বেশি অর্থ নেওয়ার অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে নেই।

প্রেষণে সিএমএসডিতে যোগদানের পর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২২ আগস্টের আদেশ অনুযায়ী মো. আব্দুর রাজ্জাককে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীন কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে (সিএমএসডি), তেজগাঁও, ঢাকায় প্রেষণে হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

অভিযোগকারীদের দাবি, সিএমএসডিতে যোগদানের পর গত প্রায় দুই বছরে বিভিন্ন কেনাকাটার বিল আটকে রেখে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করেছেন। তবে শতকোটি টাকার বেশি অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার যে অভিযোগ করা হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অভিযোগ রয়েছে, সিএমএসডিতে যোগদানের পর থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা হয়েও আব্দুর রাজ্জাক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যক্রমে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করছেন। তার প্রভাবের কারণে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অনেক ক্ষেত্রে বিব্রত বা তটস্থ থাকেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

অভিযোগ অস্বীকার আব্দুর রাজ্জাকের

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সিএমএসডির অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস অফিসার মো. আব্দুর রাজ্জাক তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।

তিনি বলেন, চাকরিজীবনের শুরু থেকেই সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলেও দাবি করেন তিনি।

এ অবস্থায় কমিশন আদায়, বিল আটকে রাখা, কথিত ভুয়া বিল এবং বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। তাদের মতে, তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলো সত্য কি না, সরকারি অর্থের কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না এবং সম্পদগুলোর বৈধ উৎস রয়েছে কি না—তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ