
বিদেশে অস্থায়ীভাবে গাড়ি চালানোর জন্য বাংলাদেশি চালকদের আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট (আইডিপি) প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে এ পারমিট ইস্যুর দায়িত্বে রয়েছে অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (অঅই)। তবে প্রতিষ্ঠানটির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলী ফুয়াদ পাশা বাবুলের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ভুয়া আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট প্রদান, জালিয়াতি, অর্থ পাচার এবং অবৈধভাবে বিপুল সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নানা অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগে কয়েক মাস আগে আলী ফুয়াদ পাশা বাবুলকে অঅই থেকে অপসারণ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, চাকরিচ্যুত হওয়ার পরও তিনি প্রতিষ্ঠানের পুরোনো সিল, ফরম, লাইসেন্স বই এবং যোগাযোগ নম্বর ব্যবহার করে নিজ বাসা থেকে আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট ইস্যুর কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
ভুয়া আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট দেওয়ার অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপানসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের কাছে ভুয়া আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট সরবরাহ করা হয়েছে। অনেক ভুক্তভোগী বিদেশে গিয়ে জানতে পারেন, তাদের হাতে থাকা পারমিটটি বৈধ নয় এবং তা কোনো দেশেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে রাজধানীর মিরপুর-১২ এলাকার পল্লবীর ৮ নম্বর রোডের ৩৯ নম্বর নিজস্ব ভবন থেকে দালালচক্রের মাধ্যমে এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সাধারণ গ্রাহকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ না করে মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে পারমিট সরবরাহ করা হয়। দ্রুত পারমিট করে দেওয়ার আশ্বাসে প্রতি গ্রাহকের কাছ থেকে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
একাধিক ভুক্তভোগী দাবি করেছেন, বাবুলের কাছ থেকে সংগৃহীত আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট বিদেশে কোনো কাজে আসেনি। নিউইয়র্কপ্রবাসী এক ব্যক্তির আত্মীয়ের জন্য সংগ্রহ করা একটি পারমিট পরবর্তীতে ভুয়া হিসেবে প্রমাণিত হওয়ায় তিনি বিদেশে গাড়ি চালাতে পারেননি। একই ধরনের প্রতারণার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন আরও কয়েকজন।
জাপানপ্রবাসী এক ভুক্তভোগী জানান, ভুয়া পারমিট ব্যবহারের কারণে তিনি আইনি জটিলতায় পড়েছিলেন এবং অল্পের জন্য বড় ধরনের শাস্তি এড়াতে সক্ষম হন। অথচ ওই পারমিট সংগ্রহে তাকে প্রায় ৭ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়েছিল।
বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ
বিভিন্ন সূত্রের দাবি, আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট সংশ্লিষ্ট অনিয়ম এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আলী ফুয়াদ পাশা বাবুল ও তার পরিবারের সদস্যরা বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মিরপুর পল্লবীর ১২/সি, ৮/৩৯ নম্বর ভবনে তার ১১টি ফ্ল্যাট ও একটি গ্যারেজ রয়েছে। এছাড়া রাজধানীর শান্তিনগরের সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় প্রায় ১০টি ফ্ল্যাট, মিরপুর ডিওএইচএসে প্রায় ২ হাজার ২০০ বর্গফুটের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও গ্যারেজ, মাটিকাটায় ৫ কাঠা জমির ওপর টিনশেড বাড়ি এবং কচুক্ষেত-ইব্রাহিমপুর এলাকায় আরও সম্পত্তি থাকার অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া কক্সবাজারের একটি চার তারকা মানের হোটেলে পরিবারের সদস্যদের নামে শেয়ার, উত্তরা, আব্দুল্লাহপুর, টঙ্গী, গাজীপুর, সাভার, ভালুকা ও ত্রিশালসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় জমি ও স্থাবর সম্পত্তি থাকার অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, উত্তরা সেক্টর-১৩ এলাকায় রূপায়ণ সিটির পাশেও তার একাধিক প্লট বা জমি রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ থাকার অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতের কলকাতায় তার ডুপ্লেক্স বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে, যা তার ছেলে রাশেদুল হাসান তদারকি করেন।
ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশি এনআইডি পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ
আলী ফুয়াদ পাশা বাবুলের বিরুদ্ধে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ হলো, তিনি তার পল্লবীর বাসার ঠিকানা ব্যবহার করে একাধিক ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং ভোটার নিবন্ধনের সুবিধা পাইয়ে দিয়েছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, এসব ব্যক্তির ভোটার এলাকা ছিল মিরপুরের পল্লবী সেকশন-১২, ব্লক-সি। তাদের মধ্যে আশিক ইকবাল, হাসিনা বেগম, শেখ মোজাচ্ছার নাজার, শাকিলা বেগম, মাসুম আহমেদ এবং আলতাফ হোসেনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এদের অনেকে প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় নাগরিক এবং বাবুলের সহযোগিতায় বাংলাদেশি পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেছেন। বিষয়টি তদন্ত করলে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পারিবারিক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ
বিভিন্ন অভিযোগে বলা হয়েছে, আলী ফুয়াদ পাশা বাবুল, তার ছেলে রাশেদুল হাসান, জামাতা আশরাফুল আলম লিটন এবং সহযোগী ববি আজম দীর্ঘদিন ধরে অঅই-এর গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতেন।
অভিযোগ রয়েছে, লাইসেন্স বই, ফরম, রেজিস্টার, মানি রিসিভ বইসহ বিভিন্ন অফিসিয়াল নথি তাদের পছন্দের প্রিন্টিং প্রেস থেকে ছাপানো হতো। এসব নথিতে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ব্যবহারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে সত্যায়নের ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া জরুরি সেবার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং গ্রাহকদের জাল লাইসেন্স সরবরাহের অভিযোগও রয়েছে।
চাকরিচ্যুতির পরও অফিসিয়াল নম্বর ব্যবহারের অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, অঅই থেকে অপসারণের পরও আলী ফুয়াদ পাশা বাবুল ও তার পরিবারের সদস্যরা প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে যাচ্ছেন। ফলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এবং প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, অঅই এখনো বাবুল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। একই সঙ্গে তাদের কাছে থাকা অফিসিয়াল সিল, লাইসেন্স বই ও অন্যান্য নথি উদ্ধারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও নেওয়া হয়নি।
অর্থ পাচারের অভিযোগ
আলী ফুয়াদ পাশা বাবুলের বিরুদ্ধে প্রায় ৮ থেকে ১০ কোটি টাকা অবৈধভাবে ভারতে পাচারের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই অর্থ দিয়ে ভারতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দোকান, বাড়ি এবং ভূমি ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, তার ছেলে রাশেদুল হাসান বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে ভারতে চলে গেছেন এবং বর্তমানে কলকাতায় অবস্থান করছেন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি বাংলাদেশে এসে একটি ব্যক্তিগত গাড়ি বিক্রি করে সেই অর্থও ভারতে নিয়ে গেছেন।
অভিযোগ অস্বীকার
তবে আলী ফুয়াদ পাশা বাবুল তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, বর্তমানে তিনি এসব কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত নন এবং তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
অন্যদিকে অঅই-এর কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, চাকরিচ্যুত হওয়ার পরও তিনি প্রতিষ্ঠানের পুরোনো সিল, লাইসেন্স বই ও নথিপত্র ব্যবহার করে ভুয়া আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট বিতরণ করছেন। এ বিষয়ে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ চলছে বলেও তারা জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উত্থাপিত অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

