
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের হিসাব সহকারী মো. মনির হোসেনকে ঘিরে দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য, ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, নিয়োগ বাণিজ্য এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি রেজাউল করিম নামে এক ব্যক্তি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে বিস্তারিত অভিযোগ দাখিল করেছেন।
অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, মাত্র কয়েক বছরের চাকরি জীবনে মনির হোসেন এমন বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন, যা তার বৈধ আয়ের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অভিযোগকারী দাবি করেন, একজন দিনমজুর কৃষকের সন্তান হিসেবে অত্যন্ত সাধারণ পারিবারিক অবস্থা থেকে উঠে আসা মনির হোসেন চাকরিতে যোগদানের পর অস্বাভাবিকভাবে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন।
সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, মনির হোসেন গাইবান্ধার ফুলছড়ি ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নিজের নামে, বাবা-মায়ের নামে, স্ত্রীদের নামে এবং ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের নামে বিপুল পরিমাণ জমি ক্রয় করেছেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, এসব সম্পদের বড় অংশ প্রথমে পরিবারের সদস্যদের নামে কেনা হয় এবং পরে হেবা বা দানপত্রের মাধ্যমে মালিকানা পরিবর্তন করা হয়, যাতে সম্পদের প্রকৃত উৎস গোপন রাখা যায়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, গাইবান্ধার মদনের পাড়া এলাকায় তিনি কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বিলাসবহুল পার্ক ক্রয় করেছেন। এছাড়া ফুলছড়ি ও সুন্দরগঞ্জে একাধিক জমি, বগুড়া শহরে ফ্ল্যাট ও জমি, গাইবান্ধা পৌর এলাকায় মূল্যবান সম্পত্তি এবং ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তার বিনিয়োগ রয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে শতকোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে।
ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, মনির হোসেন ও তার ঘনিষ্ঠজনদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয়েছে। জনতা ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক এবং ডাচ-বাংলা ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় কোটি কোটি টাকার লেনদেন ও আমানতের তথ্য তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে আত্মীয়-স্বজনের নামে ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে আর্থিক লেনদেন পরিচালনা করা হয়েছে বলেও সন্দেহ করা হচ্ছে।
নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ
মনির হোসেনের বিরুদ্ধে চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগও আনা হয়েছে। অভিযোগকারী দাবি করেন, সরকারি চাকরি পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বহু মানুষের কাছ থেকে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প, ব্ল্যাংক চেক এবং নগদ অর্থ গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, চাকরির আশায় অর্থ প্রদান করলেও অনেকেই কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাননি। পরে টাকা ফেরত চাইলে বিভিন্নভাবে হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও করা হয়েছে।
ব্যক্তিজীবন নিয়েও বিতর্ক
অভিযোগপত্রে মনির হোসেনের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কেও নানা তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে একাধিক বিয়ে, পারিবারিক বিরোধ এবং বৈবাহিক সম্পর্ক নিয়ে চলমান আদালত মামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়েছে।
মনির হোসেনের দ্বিতীয় স্ত্রী নিশাত রিমা অভিযোগ করেন, বিয়ের পর তার পরিবারের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তাকে বৈবাহিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, এ বিষয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে।
তবে এসব ব্যক্তিগত অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এ বিষয়ে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম বলেন,
“অভিযোগটি আমাদের কাছে এসেছে। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চেয়েছি। তিনি ব্যাখ্যা জমা দিয়েছেন এবং তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।”
অন্যদিকে অভিযুক্ত হিসাব সহকারী মো. মনির হোসেন তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,
“আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”
তদন্তের দাবি
সুশীল সমাজ ও স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, অভিযোগে যেহেতু বিপুল সম্পদ, ব্যাংক লেনদেন, নিয়োগ বাণিজ্য এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের মতো গুরুতর বিষয় উঠে এসেছে, তাই দুদক ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।

