
বেনজীরের রিসোর্টের জমি অধিগ্রহণে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে আলোচনায় ছিলেন
একাধিক বদলির আদেশ জারি ও বাতিলের পরও বহাল কেএমপিতে
খুলনায় আরও অন্তত ১৭ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অপরাধী চক্রের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ
খুলনার অপরাধজগত নিয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধানে বারবার উঠে এসেছে একটি নাম—পুলিশ পরিদর্শক তৈমুর ইসলাম। বর্তমানে তিনি খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)-তে কর্মরত। তবে বিভিন্ন ভুক্তভোগী, স্থানীয় সূত্র এবং পুলিশের অভ্যন্তরীণ নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, মামলা, গ্রেপ্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন, অর্থ আদায় এবং অপরাধী চক্রের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে তিনি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত।
তৈমুর ইসলামের বর্তমান কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ১৩ জন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৯ জন পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক ছিলেন। তাঁদের ভাষ্য, তৈমুর ইসলামের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বললে প্রশাসনিক হয়রানি, মিথ্যা মামলায় জড়ানো কিংবা গ্রেপ্তারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অভিযোগ রয়েছে, মামলা দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখলে সহায়তা, ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে গ্রেপ্তার দেখানো এবং বিভিন্ন অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার মতো কর্মকাণ্ডে তাঁর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর কেএমপিতে যোগ দেন তৈমুর ইসলাম। এরপর থেকে তিনি ডিবির পরিদর্শক (ওসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। খুলনার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। পুলিশের নথি অনুযায়ী, তাঁর স্থায়ী ঠিকানা খুলনা সদরের খানজাহান আলী সড়কে। পড়াশোনা করেছেন খুলনার আজম খান সরকারি কমার্স কলেজে। চাকরিজীবনের বড় একটি সময়ও কেটেছে খুলনায়। স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘ যোগাযোগের কারণে তিনি পুলিশ ও রাজনৈতিক মহলে একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বেনজীর-ঘনিষ্ঠ পরিচয় ও রিসোর্টের জমি বিতর্ক
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আলোচিত সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন তৈমুর ইসলাম। বেনজীর আহমেদের গোপালগঞ্জের সাভানা ইকোরিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ কার্যক্রমে তাঁর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
২০২৪ সালের মে মাসে জমি বিক্রি করা ২৭টি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁদের অধিকাংশের অভিযোগ ছিল—ভয়ভীতি প্রদর্শন করে জমি বিক্রিতে বাধ্য করা হয়েছিল এবং এ কাজে তৈমুর ইসলামের ভূমিকা ছিল। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।
বদলির আদেশের পরও বহাল
তৈমুর ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো পুলিশের ইন্টারনাল ওভারসাইট (পিআইও) ইউনিটের নজরদারি প্রতিবেদনে উঠে আসে। পরবর্তী অনুসন্ধানে তাঁকে সংবেদনশীল পদ থেকে সরিয়ে অন্য ইউনিটে বদলির সুপারিশও করা হয়।
২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর তাঁকে ট্যুরিস্ট পুলিশে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। পরে সেই আদেশ বাতিল করে খুলনা রেঞ্জে পদায়ন করা হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি কেএমপি ছাড়েননি। একাধিক সূত্রের দাবি, বদলির আদেশ কার্যকর না হওয়ার পেছনে উচ্চপর্যায়ের তদবির কাজ করেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে বাহিনীতে নিজ জেলা বা নিজ মহানগরে কর্মকর্তাদের পদায়ন না করার নীতি থাকলেও তৈমুর ইসলামের ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি। একাধিক আদেশ জারি এবং পরবর্তীতে তা বাতিল হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) এ কে এম আওলাদ হোসেন বলেন, ফাইল না দেখে তিনি মন্তব্য করতে পারবেন না। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে আর কথা বলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়-সংক্রান্ত বিরোধে নাম
খুলনার প্রথম বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ড নিয়ে বিরোধের ঘটনাতেও তৈমুর ইসলামের নাম এসেছে।
প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টিদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বের মধ্যে মামলার বাদী ও প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি পবিত্র কুমার সরকারকে ২০২৫ সালের ৪ এপ্রিল গভীর রাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় ডিবি পুলিশ। পরে তাঁকে একটি পুরোনো ভাঙচুর মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়, যেখানে তাঁর নাম এজাহারে ছিল না।
পবিত্র সরকারের দাবি, ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়-সংক্রান্ত মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে তাঁকে চাপ দেওয়া হয় এবং শারীরিক নির্যাতনেরও শিকার হন তিনি। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তৈমুর ইসলাম। তাঁর বক্তব্য, বিষয়টি রাজনৈতিক এবং এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাই ভালো বলতে পারবেন।
পিআইও প্রতিবেদনে গুরুতর অভিযোগ
পুলিশের ইন্টারনাল ওভারসাইট (পিআইও) প্রতিবেদনে তৈমুর ইসলামের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়
- ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে উৎকোচ গ্রহণ
- জব্দ তালিকা ছাড়াই যানবাহন নিয়ে যাওয়া
- চিহ্নিত অপরাধীদের গ্রেপ্তার না করার বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ
- জুয়া ও মাদক ব্যবসার স্পট থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে ব্যবসায়ী ও আসামিদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে তৈমুর ইসলাম দাবি করেছেন, এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।
পিআইও প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অনুসন্ধান শেষে কেএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ রাশিদুল ইসলাম খান তাঁকে একটি ‘নন-সেনসিটিভ’ ইউনিটে বদলির সুপারিশ করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় পর্যায়ে তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের নেতিবাচক জনমতের কারণে পুলিশ সদস্য ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
বিভাগীয় শাস্তি ও দুদক মামলা
১৯৯৫ সালে উপপরিদর্শক (এসআই) হিসেবে পুলিশে যোগ দেন তৈমুর ইসলাম। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চাকরি জীবনে অন্তত আটবার বিভাগীয় শাস্তির মুখোমুখি হয়েছেন তিনি।
২০২৪ সালে তাঁর এক বছরের জ্যেষ্ঠতা বাতিল করা হয়। এর আগে ২০২০ সালে অবৈধ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে পাঁচ বছরের জন্য নিম্ন বেতন গ্রেডে অবনমিত করা হয়েছিল।
এ ছাড়া জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০২১ সালে তাঁর বিরুদ্ধে দুদকের একটি মামলা হয়, যার তদন্ত এখনো চলমান। সম্প্রতি তাঁর আর্থিক লেনদেন ও সম্পদসংক্রান্ত তথ্যও চেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
তবে এসব অভিযোগ, বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং দুদকের মামলাকে ‘উদ্দেশ্যমূলক’ বলে দাবি করেছেন তৈমুর ইসলাম।
শুধু তৈমুর নন, অভিযোগে আরও পুলিশ সদস্য
খুলনার অপরাধচক্র নিয়ে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শুধু তৈমুর ইসলাম নন; বিভিন্ন থানার কর্মকর্তা ও সদস্যসহ অন্তত ১৭ জন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগসাজশ, চাঁদাবাজি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
এর মধ্যে লবণচরা থানা ও পুলিশ ক্যাম্পের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে ঈদ উপলক্ষে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের পর তাঁদের পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়। সম্প্রতি খুলনা থানার এক উপপরিদর্শকের বিরুদ্ধেও মাদক ব্যবসায়ীকে অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।
‘বিচারহীনতা সংগঠিত অপরাধকে টিকিয়ে রাখে’
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কোনো অপরাধের কার্যকর বিচার না হলে তা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক চর্চায় পরিণত হয়। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রশ্রয় থাকলে সেই অপরাধ সংগঠিত কাঠামো লাভ করে।
তাঁর মতে, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযোগ, অভ্যন্তরীণ তদন্ত এবং বদলির সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও ব্যবস্থা না নেওয়া হলে সেটি শুধু ব্যক্তির দায় নয়; সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়ও তৈরি করে। সংগঠিত অপরাধ দমনে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সুরক্ষার সংস্কৃতি ভাঙা জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

