রবিবার, মে ২৪, ২০২৬

এলজিইডিতে ভয়াবহ দু’র্নী’তির অ’ভিযোগ, ‘সি’ন্ডিকেটের হোতা’ অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) পিরোজপুর জেলার একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পে ভয়াবহ দুর্নীতি, ভুয়া স্কিম এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই দুর্নীতির অন্যতম হোতা হিসেবে কাজ করেছেন এলজিইডি বরিশাল বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শেখ মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম। অভিযোগ রয়েছে, তার নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করেছে।

দুদক ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনায় জানা যায়, পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া, ভান্ডারিয়া, নাজিরপুর ও সদর উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় বাস্তব কাজ ছাড়াই বা নামমাত্র কাজ দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, IBRP, CAFDARID, PDRIDP এবং BDIRWSP প্রকল্পের আওতায় শত শত ভুয়া ও কল্পিত স্কিম দেখিয়ে সরকারি কোষাগার থেকে কোটি কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শেখ মোহাম্মদ নুরুল ইসলামের প্রত্যক্ষ যোগসাজশে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুস সাত্তার হাওলাদার, সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম এবং হিসাব রক্ষণ ও নিরীক্ষা বিভাগের একটি চক্র এই অর্থ আত্মসাতে জড়িত ছিল।

নথিপত্রে দেখা যায়, শুধু পিরোজপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ১২৮টি ভুয়া বা কল্পিত স্কিম দেখিয়ে প্রায় ২৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এর মধ্যে ভ্যাট ও আয়কর বাদ দিয়ে ২০ কোটি ৬৯ লাখ টাকার বেশি সরাসরি আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ সড়ক অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্প (CAFDARID)-এর আওতায় আরও ৬৯টি ভুয়া স্কিম দেখিয়ে ২০ কোটি ৬৩ লাখ টাকার বেশি বিল উত্তোলনের তথ্য পেয়েছে দুদক।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এসব প্রকল্পে কাজ বাস্তবে সম্পন্ন হয়েছে কি না তা যাচাই ছাড়াই বিল অনুমোদন দেওয়া হতো। নিয়ম অনুযায়ী কাজের পরিমাপ বই (এমবি) প্রস্তুত না করেই ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে অর্থ ছাড় করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, আত্মীয়-স্বজন কিংবা বেনামি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ ভাগিয়ে দিয়ে পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করা হতো।

দুদকের অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, বরিশাল বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে শেখ মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম এসব প্রকল্পে সরাসরি অনুমোদন ও তদারকির ভূমিকা পালন করেন। প্রকল্প বাস্তবায়নের কোনো কার্যকর যাচাই ছাড়াই কোটি কোটি টাকার বিল অনুমোদনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, আত্মসাৎ করা বিপুল অর্থের একটি বড় অংশ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হতো এবং এর একটি অংশ অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর কাছেও পৌঁছাত। এর বিনিময়ে অধস্তন কর্মকর্তাদের সুরক্ষা ও প্রশ্রয় দেওয়া হতো বলেও তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ঘটনায় দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, পিরোজপুর শেখ মোহাম্মদ নুরুল ইসলামসহ ২১ জন কর্মকর্তাকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছে। তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ১০৯ ও ২০১ ধারাসহ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নয়নের নামে সাধারণ মানুষের করের টাকা এভাবে লুটপাট হওয়া রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য চরম উদ্বেগজনক। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ এলজিইডির ভাবমূর্তিকেও বড় ধরনের সংকটে ফেলেছে। এখন সাধারণ মানুষের নজর আইনি প্রক্রিয়ার দিকে—এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আদৌ দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ