রবিবার, মে ২৪, ২০২৬

গণপূর্তের ক্রয় কমিটিকে ঘিরে ঘুষ-বাণিজ্যের অ’ভিযোগ, তদন্ত দাবি

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম বিভাগের ক্রয় কমিটিতে তালিকাভুক্তিকে কেন্দ্র করে তিন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ফ্ল্যাট ও কোটি টাকার ঘুষ গ্রহণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বিভিন্ন পণ্য ও সরঞ্জাম শিডিউলভুক্ত করার বিনিময়ে অবৈধ আর্থিক লেনদেন হয়েছে।

অভিযুক্ত কর্মকর্তারা হলেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলমগীর খান, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেখর চন্দ্র মন্ডল। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, একটি লিফট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্য গণপূর্ত অধিদপ্তরের শিডিউলে অন্তর্ভুক্ত করতে মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে ক্রয় কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করে। এ ঘটনায় অন্যান্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে বলেও জানা গেছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অর্থবছরের শেষভাগ ও জুন মাসকে কেন্দ্র করে গণপূর্ত অধিদপ্তরে কেনাকাটা ও দরপত্র কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ বাড়তে থাকে। বিভিন্ন ঠিকাদার ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অভিযোগ করেছেন, তালিকাভুক্তি, কার্যাদেশ এবং বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, নিম্নমানের পণ্য উচ্চমূল্যে ক্রয়, কমিশন বাণিজ্য, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাব খাটিয়ে পদোন্নতি বাণিজ্যের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ দুর্নীতির নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

আশরাফুল হকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ

অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হকের বিরুদ্ধে পদোন্নতি বাণিজ্য, কমিশন গ্রহণ এবং ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তদবির ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে পদোন্নতির তালিকা প্রভাবিত করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এছাড়া অতীতে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম, ঠিকাদারদের সঙ্গে আঁতাত এবং কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

সূত্র বলছে, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিপুল প্রভাব বিস্তার করেন। একই সঙ্গে বিদেশে অর্থ পাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আলমগীর খানের বিরুদ্ধে ভুয়া নিয়োগ ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলমগীর খানের বিরুদ্ধে ভুয়া নিয়োগ দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাত, টেন্ডার বাণিজ্য এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে।

একাধিক সূত্রের দাবি, ই/এম বিভাগের একটি ইউনিটে বাস্তবে সীমিতসংখ্যক গাড়ি থাকলেও কাগজে-কলমে বিপুলসংখ্যক চালকের নামে বেতন-ভাতা উত্তোলন করা হয়েছে। এতে বছরে লাখ লাখ টাকা সরকারি কোষাগার থেকে তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া জাতীয় স্মৃতিসৌধ এলাকায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পের কিছু যন্ত্রপাতি কার্যকর না থাকা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করা হয়।

অডিট রিপোর্টেও বিভিন্ন আর্থিক অসঙ্গতির তথ্য উঠে এলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলেও মো. আলমগীর খানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

শেখর চন্দ্র মন্ডলের বিরুদ্ধে টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ

তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেখর চন্দ্র মন্ডলের বিরুদ্ধেও টেন্ডার বাণিজ্য, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকার অভিযোগ উঠেছে।

সূত্র জানায়, বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিং নেওয়া এবং ঠিকাদারি কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে বিদেশে অর্থ পাচার ও দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও সামনে এসেছে।

অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও একটি প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে বহাল রয়েছেন বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি

বিশ্লেষকদের মতে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের একটি অংশে দীর্ঘদিন ধরে জবাবদিহির অভাব তৈরি হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যকর তদন্ত ছাড়া এসব অভিযোগের সুরাহা সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, ভুয়া নিয়োগ বা অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হলে তা স্পষ্ট দুর্নীতির শামিল এবং এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

সচেতন মহল বলছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের ক্রয় ও টেন্ডার কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় বন্ধ করা সম্ভব হবে না।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ