
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) মানিকগঞ্জ কার্যালয়ের ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও দালালচক্রের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই কার্যক্রমের প্রশাসনিক তদারকির দায়িত্বে থাকা সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) মাহবুব কামালের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর দায়িত্বাধীন পরীক্ষাকেন্দ্রে ঘুষের বিনিময়ে অযোগ্য প্রার্থীদের লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে, অথচ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
সূত্র জানায়, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও অনেক পরীক্ষার্থীকে পরিকল্পিতভাবে প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় ফেল দেখানো হয়। পরে দালালদের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে সেই ফল পরিবর্তন করে ‘পাস’ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরীক্ষার্থীদের দাবি, দালালচক্রের সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়া লাইসেন্স পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
বিআরটিএ সংশ্লিষ্টরা জানান, ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা পরিচালনার জন্য নির্ধারিত বোর্ড থাকলেও সার্বিক প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও মাঠ তদারকির দায়িত্ব সহকারী পরিচালকের ওপর বর্তায়। পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণ, মাঠ ব্যবস্থাপনা এবং শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না হওয়ায় দালালদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে মানিকগঞ্জ কালেক্টরেট স্কুল মাঠে মোটরসাইকেলের প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষাকেন্দ্রে দেখা যায়, পরীক্ষার বিভিন্ন ধাপে দালালদের সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কে আগে পরীক্ষা দেবে, কার ফলাফল কী হবে—এসব বিষয়েও প্রভাব খাটানো হচ্ছে। পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ, অনেক সময় অর্থের বিনিময়ে ফেল প্রার্থীকে পাস দেখানো হয়।
প্রাইভেট কার চালনার পরীক্ষাতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিআরটিসির কিছু ইনস্ট্রাকটর ও দালালের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের সরাসরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে, যা নিয়মবহির্ভূত। একাধিক পরীক্ষার্থী দাবি করেছেন, দক্ষতা না থাকলেও দালালদের মাধ্যমে যোগাযোগ করলে সহজেই লাইসেন্স পাওয়া যাচ্ছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, পরীক্ষার সময় মোটরসাইকেল ও গাড়ি ভাড়ার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থের একটি অংশ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়। তবে এসব অনিয়ম রোধে সহকারী পরিচালক মাহবুব কামালের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, দীর্ঘদিন ধরে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে এমন পরিস্থিতি চলতে থাকায় প্রশাসনিক দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। নিয়মিত তদারকি, আকস্মিক পরিদর্শন ও দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব ছিল বলে মনে করছেন তারা।
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অযোগ্য চালকদের লাইসেন্স প্রদান শুধু দুর্নীতির বিষয় নয়, এটি জননিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। দক্ষতা ছাড়াই লাইসেন্স পাওয়া চালকদের কারণে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে বলে তারা মনে করছেন।
এ বিষয়ে সহকারী পরিচালক মাহবুব কামালের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের দাবি, অভিযোগ দীর্ঘদিনের এবং বিষয়টি প্রকাশ্য হওয়া সত্ত্বেও কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় প্রশাসনের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। তারা বিআরটিএ মানিকগঞ্জ কার্যালয়ের কার্যক্রম নিয়ে বিভাগীয় তদন্ত এবং দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

