Tuesday, August 11, 2026

গণপূর্তে লটারির গণবদলি নিয়ে তোলপাড়, কেপিআই নিরাপত্তায় উদ্বেগ

গণপূর্ত অধিদপ্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা বলে লটারির মাধ্যমে গণবদলি প্রক্রিয়া শুরু হলেও তা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। কর্মকর্তাদের অভিযোগ, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও ব্যক্তিগত বাস্তবতা বিবেচনা না করে লটারির ভিত্তিতে পদায়নের ফলে অধিদপ্তরে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও কেপিআই (কি-পয়েন্ট ইনস্টলেশন) এলাকার রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় কিছু বিতর্কিত পোস্টিং পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানা গেছে।

অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ জুলাই প্রথম পর্যায়ে ৭৬৭ জন সিভিল উপসহকারী প্রকৌশলীকে লটারির মাধ্যমে বদলি করা হয়। এর পর ৩ আগস্ট ইলেকট্রিক ও মেকানিক্যাল (ই/এম) শাখার ২৫৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে একই প্রক্রিয়ায় পদায়ন করা হয়। সিভিল বিভাগের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৩১৭ জন, চট্টগ্রামে ১৩৩, রাজশাহীতে ৭৩, খুলনায় ৭৪, বরিশালে ৪৪, সিলেটে ৩৩, ময়মনসিংহে ২৯ এবং রংপুরে ৬৪ জনকে পদায়ন করা হয়েছে। ই/এম শাখাতেও ঢাকা বিভাগে ১১৯ জনসহ অন্যান্য বিভাগে কর্মকর্তাদের বদলি করা হয়েছে।

সূত্র আরও জানায়, আগামী ১১ আগস্ট সহকারী ও উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের এবং চলতি মাসের শেষ নাগাদ নির্বাহী প্রকৌশলীদের লটারির মাধ্যমে বদলি করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে বদলি হওয়া ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের একাংশের দাবি, এই প্রক্রিয়া গণপূর্ত অধিদপ্তরের ‘কর্মকর্তাদের বদলি/পদায়ন নীতিমালা ২০২৫’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের অভিযোগ, নীতিমালায় সাধারণত একই কর্মস্থলে তিন বছর এবং বিশেষ ক্ষেত্রে দুই বছর দায়িত্ব পালনের বিধান থাকলেও মাত্র এক মাস থেকে এক বছর চাকরি করা কর্মকর্তাদেরও বদলি করা হয়েছে।

এ ছাড়া বদলির ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতা, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিস্থিতি এবং মানবিক বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে ক্যানসারে আক্রান্ত স্বজনের চিকিৎসা, চাকরিজীবী স্বামী-স্ত্রীকে কাছাকাছি রাখাসহ বিদ্যমান মানবিক ও প্রশাসনিক বিবেচনার বিষয়গুলো উপেক্ষা করা হয়েছে বলে দাবি করছেন ক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা।

লটারিভিত্তিক পদায়ন নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে কেপিআই ও ভিআইপি এলাকাগুলোকে ঘিরে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, লটারির ফলাফলে ২০২২ ব্যাচসহ ২০১৯ ও ২০২২ ব্যাচের বেশ কয়েকজন তরুণ ও তুলনামূলক অনভিজ্ঞ ডিপ্লোমা প্রকৌশলীকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কার্য সহকারী বা ড্রাফটসম্যান পদ থেকে পদোন্নতি পাওয়া কিছু উপসহকারী প্রকৌশলীকেও কেপিআই ও ভিআইপি সেকশনে পদায়ন করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, একজন পদোন্নতিপ্রাপ্ত নারী প্রকৌশলীকে গুলশানের ভিআইপি সেকশনে এবং গোপালগঞ্জের বাসিন্দা উপসহকারী প্রকৌশলী নিমিতোষ ওঝাকে গুলশানে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের একাংশের আশঙ্কা, এসব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও প্রাক্কলন (ইস্টিমেট) তৈরির দক্ষতা পর্যাপ্ত না থাকলে রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল স্থাপনায় দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয়টিও যথাযথভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলীদের একাংশের মতে, লটারিভিত্তিক গণবদলির ফলে অধিদপ্তরের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ‘চেইন অব কমান্ড’ ব্যাহত হতে পারে। পাশাপাশি দূরবর্তী এলাকায় আকস্মিক বদলির কারণে কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্য ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে লটারির মাধ্যমে বদলি প্রক্রিয়া কখন, কীভাবে এবং কোন মানদণ্ডে কার্যকর হবে, সে বিষয়েও এখনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই বলে অভিযোগ তাদের।

এদিকে লটারিভিত্তিক বদলি প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি গণপূর্ত অধিদপ্তরের চলতি দায়িত্বে থাকা প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে ঘিরেও নানা অভিযোগ উঠেছে। তাঁর বিরুদ্ধে পোস্টিং বাণিজ্য, কথিত সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, আত্মীয়দের ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেওয়া, গোপন স্থানে অফিস পরিচালনা, রাজনৈতিক যোগাযোগ, দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং দেশে-বিদেশে অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাঁর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করে লটারির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ফলে গণপূর্ত অধিদপ্তরে প্রশাসনিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অনভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ কেপিআই ও ভিআইপি স্থাপনায় পদায়ন নিয়ে নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা দ্রুত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে প্রধান প্রকৌশলীকে ঘিরে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ