
সিলেট শহরের শিবগঞ্জ এলাকার গ্রিনহিল স্টেট কলেজের এক অফিস সহকারীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও টানা চার বছর ধরে উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষার খাতা পরীক্ষক হিসেবে মূল্যায়নের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কলেজের অফিস সহকারী জয়ন্ত দত্ত নিজেকে ‘প্রভাষক’ পরিচয়ে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের কাছে পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
এ বছরও তিনি চতুর্থবারের মতো এইচএসসি পরীক্ষার পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে জানা গেছে। বাংলা প্রথম পত্রের ৫৫৪ জন পরীক্ষার্থীর উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে তিনি সিলেট শিক্ষা বোর্ডে জমা দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সম্প্রতি বিষয়টি শিক্ষা বোর্ডের নজরে এলে তদন্তসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একজন অফিস সহকারীকে পরীক্ষক হিসেবে নিয়োগের সুপারিশ করার অভিযোগে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সীতেশ রঞ্জন বর্মনকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়েছে।
সিলেট শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে মো. আনোয়ার হোসেন চৌধুরীর গতকাল শেষ কর্মদিবস ছিল। তিনি বলেন, পরীক্ষক হওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ নির্ধারিত সব শর্ত পূরণ করতে হয়। এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে তা গুরুতর অপরাধ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত গ্রিনহিল স্টেট কলেজে ২০১১ সালে পাঠদান কার্যক্রম শুরু হয়। প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই জয়ন্ত দত্ত অফিস সহকারী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তিনি সিলেটের মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজ থেকে স্নাতক পাস কোর্স সম্পন্ন করেন এবং ২০১৯ সালে বাংলা বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষক নিয়োগসংক্রান্ত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষক যে বিষয়ে পাঠদান করেন, কেবল সেই বিষয়েই পরীক্ষক হিসেবে আবেদন করতে পারবেন। কলেজ পর্যায়ে পরীক্ষক হতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকা প্রয়োজন।
তবে গ্রিনহিল স্টেট কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জয়ন্ত দত্ত বর্তমানে অফিস সহকারী পদেই কর্মরত। তিনি পাস কোর্সে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। ফলে প্রচলিত যোগ্যতার শর্ত অনুযায়ী তার প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জয়ন্ত দত্ত বলেন, কলেজ প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই তিনি সেখানে কর্মরত। ২০১৯ সালে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর কলেজে শিক্ষক প্রয়োজন হওয়ায় তিনি বাংলা বিষয়ে পাঠদান শুরু করেন।
প্রভাষক হিসেবে নিয়োগপত্রের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিয়োগপত্রটি কলেজের প্রয়াত অধ্যক্ষ প্রশান্ত কুমার সাহার কাছে রাখা ছিল। তিনি মারা যাওয়ার পর নিয়োগপত্রটি বর্তমানে কোথায় রয়েছে, তা খুঁজে দেখতে হবে। তার কাছে ওই নিয়োগপত্রের কোনো অনুলিপিও নেই বলে জানান জয়ন্ত দত্ত।
কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সীতেশ রঞ্জন বর্মনও শিক্ষক হিসেবে জয়ন্ত দত্তের নিয়োগপত্রের অনুলিপি তার কাছে নেই বলে জানিয়েছেন। তার দাবি, নিয়োগপত্রটি কলেজ পরিচালনা পর্ষদের কাছে রয়েছে।
তবে কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সমন্বয়ক দিগ্বিজয় চক্রবর্তী বলেন, তার কাছে জয়ন্ত দত্তের নিয়োগপত্র নেই; সেটি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
এদিকে পরীক্ষক হিসেবে জয়ন্ত দত্তের আবেদন অনুমোদনের বিষয়েও দুই ধরনের বক্তব্য পাওয়া গেছে। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সীতেশ রঞ্জন বর্মনের দাবি, তিনি আবেদনটি অনুমোদন করেননি; কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সমন্বয়ক দিগ্বিজয় চক্রবর্তী এ অনুমোদন দিয়েছেন।
অন্যদিকে দিগ্বিজয় চক্রবর্তী দাবি করেন, পরীক্ষক হিসেবে আবেদন অনুমোদন করেছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষই।
ফলে জয়ন্ত দত্তের প্রকৃত পদ, পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তার যোগ্যতা এবং পরীক্ষক হিসেবে তার আবেদন কে বা কারা অনুমোদন করেছেন—এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শিক্ষা বোর্ডের তদন্তে এসব প্রশ্নের উত্তর এবং দীর্ঘ চার বছর ধরে তিনি কীভাবে পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন, তার প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

