সোমবার, জুলাই ৬, ২০২৬

কাজ হয়নি, বিল উঠেছে কোটি টাকা! মৌলভীবাজারের পানি প্রকল্পে অ’নিয়মের বি’স্ফো’রক অ’ভিযোগ

মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলায় প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন সুপেয় পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার স্থাপন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ শেষ হয়নি। এরই মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কোটি টাকার বিল তুলে কাজ ফেলে উধাও হয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

অভিযোগ রয়েছে, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের এক কর্মচারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে প্রকল্পটির নিয়ন্ত্রণে ছিলেন। স্থানীয়দের দাবি, মৌলভীবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদুজ্জামানের যোগসাজশে তিনি কাজটি বাগিয়ে নেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৩ সালে ‘প্রাইম ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড লিবার্টি ট্রেডার্স (জেভি)’ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রায় ১০ কোটি টাকার প্রকল্পটির কার্যাদেশ পায়। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় একাধিকবার সময় বাড়ানো হলেও প্রকল্পের কাজ এখনও সম্পন্ন হয়নি। অভিযোগ অনুযায়ী, কাজ অসমাপ্ত রেখেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বড় অঙ্কের বিল উত্তোলন করে কার্যত উধাও হয়ে যায়।

বিশ্বব্যাংক ও এআইআইবির অর্থায়নে এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) যৌথ বাস্তবায়নে পরিচালিত ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যবিধি’ শীর্ষক প্রকল্পটি ২০২৫ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল।

প্রকল্পের আওতায় মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলার সব ইউনিয়নে মোট ৭৬টি পানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপন এবং কমিউনিটিভিত্তিক পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিটি এলাকায় ৩০ থেকে ৪০টি দরিদ্র পরিবারকে নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, মৌলভীবাজার সদরের ৩৮টি প্রকল্পের মধ্যে মাত্র দুটি স্থানে আংশিক কাজ হয়েছে। অন্যদিকে রাজনগর উপজেলার ৩৮টি প্রকল্পের একটিতেও কাজ শুরু হয়নি।

রাজনগরের বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক এলাকাতেই প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি নেই। স্থানীয়দের অনেকেই প্রকল্প সম্পর্কে অবগত নন।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার চাঁদনীঘাট ইউনিয়নের কির্তার মহল্লায় আংশিক কাজ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চলে যাওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের অর্থায়নে প্রায় ২৫ হাজার টাকা ব্যয় করে মোটর, পাইপ ও মিটারের সংযোগ দিয়ে পানি সরবরাহ চালু করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা সুমন মালাকার বলেন, “এখানে প্রায় ৩০টি পরিবার এই লাইন থেকে পানি পাচ্ছে। কিন্তু মোটর, সিঁড়িসহ প্রয়োজনীয় অনেক কিছুই দেওয়া হয়নি। ঠিকাদার যে পাইপ বসিয়েছিল, সেটিও কয়েক দিনের মধ্যে ফেটে যায়। কাজের মান খুবই নিম্নমানের ছিল।”

এদিকে জেলা ও উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কত টাকা বিল উত্তোলন করেছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য দিতে পারেননি। এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদুজ্জামানের কার্যালয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শাহিন আলম একসময় ফেনী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ড্রাফটসম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০১৮ সালের নভেম্বরে তিনি ২১ হাজার ৪৭০ টাকা বেতন স্কেলে চাকরিতে যোগ দেন। গত বছর একটি জাতীয় দৈনিকে তার বিরুদ্ধে স্বল্প সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছিল।

প্রাইম ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড লিবার্টি ট্রেডার্স-এর অন্যতম পরিচালক রমিজ মিয়া বলেন, “এই কাজের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণে ছিল শাহিন। সে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে চাকরি করার পাশাপাশি ঠিকাদারিও করত। আমি যুক্ত থাকা অবস্থায় প্রায় ৯০ লাখ টাকার বিল উত্তোলন করা হয়েছিল। এরপর কী হয়েছে, তা আমার জানা নেই।”

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “মৌলভীবাজারের এই প্রকল্পের বিষয়ে আমাদের কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই। কত টাকা বিল উত্তোলন হয়েছে, সেটিও নিশ্চিত নই। নতুন ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ শেষ করা হবে।”

প্রকল্প পরিচালক তবিবুর রহমান তালুকদার বলেন, “শাহিন আলম নিজের নামে লাইসেন্স ব্যবহার করে কাজ করেননি। অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ব্যবহার করা হয়েছে।”।

এদিকে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, বিল উত্তোলনের পরিমাণ, ঠিকাদার নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঠিকাদারি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, প্রকল্পের অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ