রবিবার, জুলাই ৫, ২০২৬

চাঁদপুর যাত্রী টার্মিনাল প্রকল্পে ৮০ কোটি টাকার টেন্ডার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ, তদন্তের দাবি

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন চাঁদপুর যাত্রী টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের প্রায় ৮০ কোটি টাকার একটি টেন্ডারকে ঘিরে অনিয়ম, পূর্বনির্ধারিত মূল্যায়ন এবং সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে অধিক দরদাতাকে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে টেন্ডারে অংশ নেওয়া একটি যৌথ উদ্যোগ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, টেন্ডার নং ১২৯৪৯৯৩ (BRWTP-W3-LOT-02A)-এর দরপত্র ২৫ জুন বিকেলে খোলা হলেও পরদিনই কার্যাদেশ চূড়ান্ত করা হয়। অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠানের দাবি, ৮০ কোটিরও বেশি টাকার একটি আন্তর্জাতিক মানের প্রকল্পের প্রশাসনিক, কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন, যোগ্যতা যাচাই এবং অনুমোদন মাত্র এক কার্যদিবসে সম্পন্ন করা বাস্তবসম্মত নয়। তাদের অভিযোগ, মূল্যায়ন প্রক্রিয়া ছিল কেবল আনুষ্ঠানিকতা এবং কার্যাদেশের সিদ্ধান্ত আগেই নির্ধারিত ছিল।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, টেন্ডারের মূল্যায়নে সর্বনিম্ন দরদাতা যৌথ উদ্যোগের মূল্যায়িত দর ছিল ৭৬ কোটি ২৩ লাখ ৫৬ হাজার ১১ টাকা। অন্যদিকে কার্যাদেশপ্রাপ্ত মায়ার-কবিরস যৌথ উদ্যোগের মূল্যায়িত দর ছিল প্রায় ৮০ কোটি ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা বেশি দর থাকা সত্ত্বেও তাদের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠানের দাবি, সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী কারিগরি দিক থেকে যোগ্য সর্বনিম্ন দরদাতাকেই কাজ দেওয়ার বিধান রয়েছে। সে ক্ষেত্রে সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থের উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় সম্ভব হতো।

চিঠিতে কার্যাদেশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের অতীত কাজের রেকর্ড নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, বিআইডব্লিউটিএর একাধিক প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে না পারলেও একই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বাধীন যৌথ উদ্যোগকে আবারও বড় প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, কার্যাদেশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপনের পারিবারিক ও ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এবং সেই প্রভাব টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রেখেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, মায়ার লিমিটেডের চেয়ারম্যান হিসেবে মাহমুদ হাসান রিপনের স্ত্রীর নাম থাকলেও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রিপনের হাতেই রয়েছে। বর্তমানে তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করেও প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এ ঘটনায় অভিযোগকারী যৌথ উদ্যোগ কার্যাদেশ স্থগিত, পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ, স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন, পুনর্মূল্যায়ন এবং অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার নিশ্চয়তাসহ পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে। অভিযোগপত্রের অনুলিপি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বিশ্বব্যাংক, সিপিটিইউ, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থায় পাঠানো হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক কর্নেল ফেরদৌস বলেন, প্রকল্পটির অর্থায়ন বিশ্বব্যাংকের এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হলে পুরো প্রকল্প নতুন গাইডলাইনের আওতায় চলে যেত, যার ফলে আরও ছয় থেকে আট মাস বিলম্ব হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তিনি বলেন, এ কারণেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দ্রুত মূল্যায়ন সম্পন্ন করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, ই-জিপি ব্যবস্থায় মূল্যায়নের সময় সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানের দাখিল করা কিছু আর্থিক ও অডিট সংক্রান্ত নথিতে অসঙ্গতি পাওয়া যায়। ফলে প্রতিষ্ঠানটিকে কারিগরি দিক থেকে অযোগ্য (টেকনিক্যালি নন-রেসপন্সিভ) ঘোষণা করা হয়। তার দাবি, সব সিদ্ধান্ত সরকারি ক্রয়বিধি ও বিশ্বব্যাংকের প্রকিউরমেন্ট গাইডলাইন অনুসরণ করেই নেওয়া হয়েছে এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর কোনো সুযোগ ই-জিপি ব্যবস্থায় নেই।

তবে অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠানের দাবি, তাদের জমা দেওয়া প্রয়োজনীয় টার্নওভার টেন্ডারের শর্ত পূরণের জন্য যথেষ্ট ছিল। অতিরিক্ত কিছু নথির অসঙ্গতিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে তাদের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে বলে তারা অভিযোগ করেছে।

এদিকে ঠিকাদার মহলের একটি অংশের অভিযোগ, একই প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে টেন্ডারের কিছু শর্ত শিথিল করা হয়েছে এবং পূর্ববর্তী টেন্ডারে অযোগ্য বিবেচিত হওয়া প্রতিষ্ঠানকে পুনরায় যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।

টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষাপটে প্রকল্পটির মূল্যায়ন, কার্যাদেশ এবং ক্রয়প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ