
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য, প্রকল্পে অনিয়ম, ভুয়া বিল অনুমোদন এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ এনে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত আবেদন করেছেন রেলওয়ের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রমজান আলী। সম্প্রতি জমা দেওয়া ওই অভিযোগপত্রে আফজাল হোসেনকে দুর্নীতির একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নেতৃত্বদানকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, পদ্মা সেতু রেলসংযোগ প্রকল্প এবং খুলনা-মোংলা রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আফজাল হোসেন ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম, সরকারি অর্থের অপচয় এবং ঠিকাদারদের অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক পদে নিয়োগ পেতেও তিনি বড় অঙ্কের ঘুষ দিয়েছেন বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারী রমজান আলীর ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে রেলওয়েকে কেন্দ্র করে ঠিকাদার, প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী দুর্নীতির চক্র গড়ে উঠেছে, যা বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারি অর্থ লুটপাট করেছে।
রেলওয়ের একাধিক সূত্রের দাবি, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ খাত রেলওয়েকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বর্তমান মহাপরিচালক। অভিযোগে বলা হয়েছে, পদ্মা সেতু রেলসংযোগ প্রকল্প থেকে শুরু করে খুলনা-মোংলা রেললাইন প্রকল্প পর্যন্ত বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে শত শত কোটি টাকার অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। নির্ধারিত পাথরের পরিবর্তে কম দামের ইটের খোয়া ব্যবহারের অনুমোদন, ভুয়া বিলের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন এবং ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি করার অভিযোগও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
রমজান আলীর অভিযোগের ভিত্তিতে দুদকে জমা দেওয়া আবেদনপত্রে আরও বলা হয়েছে, এসব অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ায় আফজাল হোসেনের সন্তানরা বসবাস করেন এবং সেখানে অর্থ স্থানান্তরের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগপত্রে পদ্মা সেতু রেলসংযোগ প্রকল্পকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মূল চুক্তির বিভিন্ন কাজ বাতিল করে সম্পূরক চুক্তির মাধ্যমে প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়, যার ফলে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগকারীর দাবি। একই সঙ্গে রেললাইনের এমব্যাংকমেন্ট নির্মাণে নির্ধারিত পাথরের পরিবর্তে ইটের খোয়া ব্যবহারের অনুমোদন দিয়ে ঠিকাদারদের শত শত কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয় এবং এর বিনিময়ে ঘুষ গ্রহণ করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারী আরও দাবি করেন, পদ্মা সেতু রেলসংযোগ প্রকল্পে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকার অডিট আপত্তি রয়েছে। এছাড়া ঠিকাদারদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
খুলনা-মোংলা রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে নিয়মিত ঘুষ গ্রহণের বিনিময়ে নিম্নমানের কাজ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রূপসা সেতু প্রকল্পেও ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মহাপরিচালক পদে নিয়োগ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। রমজান আলীর দাবি, প্রায় ১০ কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে আফজাল হোসেন ওই পদে নিয়োগ পান। অভিযোগে বলা হয়েছে, মেধা ও জ্যেষ্ঠতায় এগিয়ে থাকা অন্যান্য কর্মকর্তাদের উপেক্ষা করে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে দুদকের ছাড়পত্র ছাড়া এবং সরকারি বিধিবিধান লঙ্ঘন করে তৃতীয় গ্রেড থেকে সরাসরি প্রথম গ্রেডে পদায়নের অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ১৩তম বিসিএস পরীক্ষায় রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং এবং রেলওয়ে পরিবহন ও বাণিজ্যিক ক্যাডারের সম্মিলিত মেধাতালিকায় আফজাল হোসেন ২২তম স্থানে ছিলেন। অথচ প্রথম স্থান অধিকারী প্রকৌশলীকে উপেক্ষা করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেলপথ উপদেষ্টাকে ঘুষ প্রদানের মাধ্যমে তিনি মহাপরিচালক পদে নিয়োগ পান বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
রেলওয়ের অভ্যন্তরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কথাও অভিযোগপত্রে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প, টেন্ডার ও সরবরাহ কাজ নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের দেওয়া হতো এবং এর বিনিময়ে কমিশন গ্রহণ করা হতো। বিভিন্ন প্রকল্পে চুক্তিমূল্যের প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগপত্রে কয়েকটি নির্দিষ্ট ভুয়া বিলের তথ্যও উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে সান্তাহার রেলওয়ে সাইডিংয়ে এক হাজার ঘনমিটার ব্যালাস্ট সরবরাহের চুক্তির বিপরীতে মাত্র ৪৯৯ ঘনমিটার পাথর সরবরাহ করেও পুরো বিল অনুমোদনের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ছয়টি ভুয়া বিলের মাধ্যমে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ ৯৪ হাজার টাকা ঠিকাদারদের পরিশোধ এবং এর বিনিময়ে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগও করা হয়েছে।
এছাড়া প্রধান প্রকৌশলী (পশ্চিম), রাজশাহী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আওয়ামী লীগ নেতা ও ঠিকাদার মো. আশরাফ আলী এবং মেসার্স সফল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আলাল পারভেজ লুলুর সঙ্গে যোগসাজশে ৩ কোটি ৪০ লাখ ৯৪ হাজার টাকার ভুয়া বিল ভাউচার প্রস্তুতের মাধ্যমে রেলওয়ের আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারী আরও দাবি করেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আফজাল হোসেন সরকার পরিবর্তনের পর দ্রুত রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করে বিএনপিপন্থী পরিচয়ে সক্রিয় হন, যাতে প্রশাসনিক প্রভাব বজায় রাখা সম্ভব হয়।
আবেদনে আরও বলা হয়েছে, দুর্নীতি ও ঘুষের মাধ্যমে অর্জিত শত শত কোটি টাকা মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় পাচার করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশে নিজের নামে এবং স্ত্রী, সন্তান, শ্বশুর-শাশুড়ি, শ্যালক-শ্যালিকা ও আত্মীয়স্বজনের নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও স্বর্ণালঙ্কার ক্রয় করা হয়েছে বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
দুদকের কাছে দেওয়া আবেদনে আফজাল হোসেন ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের অনুসন্ধান, ব্যাংক হিসাব জব্দ, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানানো হয়েছে।

