মঙ্গলবার, জুন ১৬, ২০২৬

উত্তরা ভূমি অফিসে অ’নিয়ম ও হ’য়রানির অ’ভিযোগ, আলোচনায় উপ-সহকারী কর্মকর্তা মাকসুদুর আলম

রাজধানীর উত্তরা ভূমি অফিসে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি, ফাইল নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, দালালচক্রের প্রভাব এবং অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন উত্তরা ভূমি অফিসের উপ-সহকারী কর্মকর্তা মাকসুদুর আলম। ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনকালে তিনি একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন, যার কারণে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মাকসুদুর আলম ২০১২ সালের ৩০ মে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। ২০২১ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি উত্তরা ভূমি অফিসে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি মিরপুর রাজস্ব সার্কেলের বাউনিয়া ভূমি অফিসে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি প্রায় পাঁচ বছর ধরে একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন।

দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশ্ন

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সরকারি কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট সময় পর বদলির প্রচলিত নীতিমালা থাকলেও মাকসুদুর আলম দীর্ঘ সময় ধরে একই অফিসে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এ কারণে তার প্রভাব ও যোগাযোগের পরিধি বেড়েছে বলে অভিযোগকারীদের ধারণা।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা ও সেবাগ্রহীতার অভিযোগ, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি এলাকায় শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিলেন। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।

ফাইল আটকে রাখার অভিযোগ

একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেছেন, ভূমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন আবেদন ও ফাইল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে অযথা বিলম্ব করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও নতুন নতুন আপত্তি তুলে ফাইল আটকে রাখা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

সেবাগ্রহীতাদের দাবি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় তারা আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়ছেন।

দালালচক্রের প্রভাব নিয়ে অভিযোগ

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, উত্তরা ভূমি অফিসে সাধারণ মানুষের তুলনায় দালালদের অবাধ যাতায়াত বেশি। বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে দালালদের মাধ্যমে যোগাযোগ করলে কাজ দ্রুত এগোলেও সরাসরি আবেদনকারীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে বাধ্য হন বলে অভিযোগ রয়েছে।

কয়েকজন সেবাগ্রহীতা দাবি করেন, কিছু ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করা হয়। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্তের ফলাফল প্রকাশ হয়নি।

ডিজিটাল লেনদেনের অভিযোগ

অভিযোগ রয়েছে, সরাসরি নগদ লেনদেনের পরিবর্তে বর্তমানে বিভিন্ন ডিজিটাল আর্থিক সেবার মাধ্যমে অবৈধ অর্থ গ্রহণের একটি পদ্ধতি গড়ে উঠেছে। তবে এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো নথি বা তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।

ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা

আব্দুল কুদ্দুস নামের এক সেবাগ্রহীতা অভিযোগ করেন, একটি ফাইলের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাকে জানানো হয় যে কর্মকর্তা অফিসের বাইরে তদন্ত কাজে রয়েছেন। তবে পরে তিনি ওই কর্মকর্তাকে অন্যত্র ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত অবস্থায় দেখেছেন বলে দাবি করেন।

যদিও এই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উত্তরা রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) বলেন,

“ভূমি অফিসকে সম্পূর্ণ দালালমুক্ত ও সেবাগ্রহীতা-বান্ধব করতে আমরা নিরলস কাজ করছি। কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে ফাইল আটকে রাখা কিংবা সাধারণ মানুষকে হয়রানির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মাকসুদুর আলমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোও খতিয়ে দেখা হবে।”

এদিকে ঢাকা জেলা প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন রাজস্ব কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,

“সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থেকে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন না। লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্তের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

তদন্তের দাবি

ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের দাবি, উত্তরা ভূমি অফিসে ফাইল নিষ্পত্তি, দালালচক্রের কার্যক্রম এবং সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ নিয়ে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে ভূমি সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বর্তমানে অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি ও প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আলোচনায় রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রশাসনিক তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত বিবেচ্য বিষয়।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ