মঙ্গলবার, জুন ১৬, ২০২৬

শেয়ার, সম্পদ ও মা’নি’ল’ন্ডারিং অ’ভিযোগে আলোচনায় বাংলা টিভির এমডি সৈয়দ সামাদুল হক

বাংলা টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সামাদুল হককে ঘিরে শেয়ার হস্তান্তর, আর্থিক লেনদেন, সম্পদ বিবরণী, ভাড়া সংক্রান্ত বিরোধ, প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), আদালত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দাখিল করা বিভিন্ন নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের অনেকগুলোরই এখনো চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তি হয়নি।

দুদকের নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৮ মে স্মারক নং ০০.০১.০০০০.৫০৫.০১.১৪০.২৩-এর মাধ্যমে বাংলা টিভির শেয়ার কেনাবেচার নামে অর্থ আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য গ্রহণের জন্য সৈয়দ সামাদুল হককে তলব করা হয়। ওই নোটিশে তাঁকে ২০২৩ সালের ৭ জুন দুদকের প্রধান কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য দিতে বলা হয়েছিল।

পরবর্তীতে ২০২৪ সালে দুদকের বিশেষ তদন্ত শাখা ই/আর নং-৩৬/২০২৪-এর আওতায় তাঁর দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণী যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। নথি অনুযায়ী, ২৯ এপ্রিল ২০২৪ তারিখে বিষয়টি আমলে নেওয়ার পর ৬ মে দুদকের উপপরিচালক মো. জাকারিয়ার স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে দুই সদস্যবিশিষ্ট অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়। অনুসন্ধান কার্যক্রমে সৈয়দ সামাদুল হকের ঢাকার তল্লাবাগ ও সোবহানবাগের ঠিকানা উল্লেখ করা হয়।

শেয়ার হস্তান্তর নিয়ে বিতর্ক

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া একাধিক আবেদনে বাংলা টিভি লিমিটেডের শেয়ার হস্তান্তর প্রক্রিয়া নিয়ে নানা অভিযোগ উঠে এসেছে। আবেদনে দাবি করা হয়, প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সামাদুল হক তাঁর মালিকানাধীন ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ শেয়ার কয়েকজন পরিচালকের কাছে হস্তান্তর করেন। পরবর্তীতে আরও ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ শেয়ার হস্তান্তরের বিষয়ে আলোচনা হয় এবং এর বিপরীতে কয়েক কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

তবে শেয়ার হস্তান্তরের প্রয়োজনীয় অনুমোদন না পাওয়ায় লেনদেন জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট আবেদনপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যবসায়ী মহলের কয়েকজন সদস্য অভিযোগ করেন, শেয়ার বিক্রির নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ গ্রহণ করা হলেও পরবর্তীতে শেয়ার হস্তান্তর সম্পন্ন হয়নি। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সৈয়দ সামাদুল হকের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া নথিপত্রে পাওয়া যায়নি।

ভবন ভাড়া নিয়ে বিরোধ

রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় বাংলা টিভির কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত একটি ভবন নিয়েও বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে। লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, ভবনটির মালিকের সঙ্গে ভাড়াটিয়া হিসেবে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ভবন ছাড়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের সৃষ্টি হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, ভাড়া বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ বকেয়া রয়েছে এবং বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।

তবে এ অভিযোগের বিষয়ে আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় ও উভয় পক্ষের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

দুটি ফৌজদারি মামলার তথ্য

নথিপত্র অনুযায়ী, উত্তরা পশ্চিম থানায় সৈয়দ সামাদুল হকের বিরুদ্ধে দুটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলা ২০২৫ সালের ১৪ নভেম্বর দায়ের করা হয়, যার ধারা ৩০২/১৪৯/৩৪ পেনাল কোড। অপর মামলাটি ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট দায়ের করা হয়, যেখানে ১৪৭/১৪৮/১৪৯/৩২৩/৩০৭/৩০৯/৩২৪/৩২৬/১১৪/৩৪ ধারার উল্লেখ রয়েছে।

তবে মামলাগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান থাকায় এসব অভিযোগের বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো জানা যায়নি।

সামাদুল হকের বক্তব্য

দুদকে জমা দেওয়া এক লিখিত আবেদনে সৈয়দ সামাদুল হক নিজেকে একজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি উদ্যোক্তা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, ১৯৯৯ সালে লন্ডনে বাংলা ভাষার স্যাটেলাইট টেলিভিশন ‘বাংলা টিভি’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশে এর সম্প্রচার কার্যক্রম শুরু করেন।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একটি স্বার্থান্বেষী মহল মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে দুদককে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চেয়ে আবেদনও করেন।

হাফিজুর রহমান সরকারের অভিযোগ

দিনাজপুর-৩ আসনের বিএনপি নেতা, শিল্পপতি ও সমাজসেবক আলহাজ হাফিজুর রহমান সরকারও বাংলা টিভির শেয়ার হস্তান্তর প্রসঙ্গে অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রায় ১৮ বছর আগে বাংলা টিভির শেয়ার ক্রয়ের উদ্দেশ্যে তিনি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও তাঁর নামে শেয়ার হস্তান্তর সম্পন্ন হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগকারী পক্ষের ভাষ্য, শেয়ার হস্তান্তর বিলম্বের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা কারণ দেখানো হয়েছে এবং বিনিয়োগকৃত অর্থও এখন পর্যন্ত ফেরত দেওয়া হয়নি।

বাংলা টিভির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, হাফিজুর রহমান সরকারের নামে এখনো কোনো শেয়ার হস্তান্তর সম্পন্ন হয়নি। তবে এ বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।

দুদকের মামলায় জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগ

২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন সৈয়দ সামাদুল হকের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে মামলা দায়েরের তথ্য প্রকাশ করে।

দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন নিয়মিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে জানান, অনুসন্ধানে সৈয়দ সামাদুল হকের নামে ৪ কোটি ৫ লাখ ২১ হাজার ৭৫৬ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। এ অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, অপরাধলব্ধ অর্থের মধ্যে ৩ কোটি ৫৩ লাখ ৫৯ হাজার ৪৪ টাকা বিভিন্ন উপায়ে রূপান্তর ও বৈধ হিসেবে প্রদর্শনের চেষ্টা করা হয়েছে। এ ঘটনায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে সংস্থাটি মনে করছে।

অনুসন্ধান প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, সৈয়দ সামাদুল হকের মোট সম্পদের পরিমাণ ১১ কোটি ৪১ লাখ ৬৬ হাজার ৭৭১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বিপরীতে বৈধ উৎস থেকে অর্জিত আয়ের পরিমাণ পাওয়া গেছে ৭ কোটি ৩৪ লাখ ১০ হাজার ৯০৮ টাকা।

তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার অপেক্ষা

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলা টিভিকে ঘিরে যে বিরোধ ও অভিযোগগুলো সামনে এসেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে শেয়ার মালিকানা, আর্থিক লেনদেন, সম্পদ বিবরণী, ভাড়া সংক্রান্ত বিরোধ এবং বিভিন্ন পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। এসব অভিযোগের অনেকগুলো বর্তমানে তদন্ত বা বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, শেয়ার হস্তান্তর চুক্তি, আর্থিক লেনদেনের নথি, কোম্পানির রেজিস্টার, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন এবং আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার মাধ্যমেই অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।

এ কারণে বর্তমানে উত্থাপিত বিষয়গুলো অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং চলমান অনুসন্ধানের পর্যায়ে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে প্রতীয়মান হয়। ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য এবং আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হলে বিষয়টি সম্পর্কে আরও সুস্পষ্ট চিত্র পাওয়া যাবে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ