
বরিশাল গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মানিক লাল দাসের বিরুদ্ধে টেন্ডার অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, বদলি-বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন ঠিকাদার, গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি একটি প্রভাবশালী ঠিকাদারি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন, যার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্প ও দরপত্র কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বাসিন্দা মানিক লাল দাস বিসিএস (পাবলিক ওয়ার্কস) ক্যাডারের ১৮তম ব্যাচের কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালে তিনি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঠিকাদারি সিন্ডিকেট গঠনের অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে, বরিশাল অঞ্চলে তিনি কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী ঠিকাদারি সিন্ডিকেট পরিচালনা করেন। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে খান বিল্ডার্স, রাতুল এন্টারপ্রাইজ, খান ট্রেডার্স এবং ইনভেন্ট পয়েন্ট কম্পিউটার।
অভিযোগ রয়েছে, অধীনস্থ নির্বাহী প্রকৌশলীদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ বরাদ্দের জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। এতে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অন্যান্য ঠিকাদাররা বৈষম্যের শিকার হয়েছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন
গণপূর্ত বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কিছু ক্ষেত্রে সীমিত দরপত্র পদ্ধতির (এলটিএম) পরিবর্তে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি (ওটিএম) ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
এছাড়া যশোর গণপূর্ত সার্কেলে দায়িত্ব পালনকালে কুষ্টিয়াসহ কয়েকটি জেলার বিভিন্ন প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারকে সুবিধা দিতে দরপত্র ব্যবস্থাপনায় প্রভাব খাটানো হয়েছিল।
প্রকল্প বাস্তবায়ন ও সময় বর্ধিতকরণে অনিয়মের অভিযোগ
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের সময়সীমা বৃদ্ধি, ভ্যারিয়েশন অনুমোদন এবং প্রাক্কলন সংশোধনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের পরিবর্তে নিজ উদ্যোগে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
কিছু প্রকল্পে কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ তুলে ধরেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা।
অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও টেন্ডার বাণিজ্যের মাধ্যমে মানিক লাল দাস এবং তার পরিবারের সদস্যদের নামে বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে। এসব সম্পদের মধ্যে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় জমি, বাড়ি ও অন্যান্য বিনিয়োগ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এছাড়া বিদেশে সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগও বিভিন্ন মহলে আলোচনা তৈরি করেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বপক্ষে কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন এখন পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি।
দুদকের নজরদারি
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি সূত্র জানিয়েছে, গণমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে উত্থাপিত অভিযোগগুলো পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেলে বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান বা তদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মানিক লাল দাসের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল কেটে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া মেলেনি।
তদন্তের দাবি
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ঠিকাদার এবং সচেতন নাগরিকদের একটি অংশ অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তাদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য হলে তা সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন, জনস্বার্থ এবং গণপূর্ত বিভাগের ভাবমূর্তির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তারা অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

