
বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার কালশিরা রাজেন্দ্র স্মৃতি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিধান চন্দ্র ব্রহ্মের বিরুদ্ধে ৪৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে। রহস্যজনক কারণে অভিযোগের এক বছর পার হলেও তদন্তের নামে কেবল সময়ক্ষেপণ করে চলছেন সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তারা।
ওই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা প্রধান শিক্ষকের দুর্নীতি তদন্তের দাবিতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, চিতলমারী; জেলা প্রশাসক; জেলা দুর্নীতি দমন কমিশন; জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, বাগেরহাটের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। পরবর্তীতে উপ-পরিচালক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা, খুলনা এবং পরিচালক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, ঢাকা বরাবরও অভিযোগ করা হলেও আজও কোনো সুফল পাননি তারা। বরং পদে পদে হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ শিক্ষকরা।
অভিযোগকারী শিক্ষকরা বলেন, ২০১৬ সালে অত্র বিদ্যালয়ে বিধান চন্দ্র ব্রহ্ম প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। যোগদানের পর থেকেই তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। এরপর থেকে প্রভাব খাটিয়ে প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় ইচ্ছামতো পরিচালনা করে বড় অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করেন। নিজেকে বাঁচাতে ২৬ অক্টোবর ২০২৪ সালে প্রভাত কুমার মজুমদারকে প্রধান করে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিটি গঠন করেন। নিরীক্ষা কমিটি ২৬ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনে প্রধান শিক্ষকের দুর্নীতির চিত্র ফুটে ওঠায় তিনি প্রতিবেদনটি সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন।
ফলে নিরীক্ষা কমিটি ও ওই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা গত ১৯ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ করেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে তিন দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে তদন্তকাজ সুষ্ঠু ও দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করার জন্য ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে উপজেলা সমবায় অফিসার, চিতলমারীকে সম্পৃক্ত করা হয়।
প্রথম শুনানির জন্য ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নোটিশ দিয়ে ১ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে সহকারী শিক্ষকদের ডাকা হয়। ওই দিন প্রধান শিক্ষক সময় চাওয়ার কারণ দেখিয়ে শুনানি স্থগিত করে। পরবর্তীতে ১৬ জানুয়ারি পুনরায় দায়সারা ভাবে শুনানি হয়। এ বিষয়ে সর্বমোট ১০–১২ বার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ ৩০ জুন তদন্তের জন্য শুনানি হলেও তার কোনো প্রতিবেদন আজও প্রকাশিত হয়নি।
অভিযোগে আরো বলা হয়, বিগত সরকারের আমলে বিধান চন্দ্র ব্রহ্ম আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ছিলেন। পদের প্রভাব খাটিয়ে সীমাহীন দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. মফিজুর রহমান উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে বিগত সরকারের আমল থেকেই বিধান চন্দ্র ব্রহ্মের সুসম্পর্ক রয়েছে। ওই কর্মকর্তা তদন্তকারী হিসেবে থাকলে তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখবে না বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
সহকারী শিক্ষক অপূর্ব কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘আমি চাই আর্থিক দুর্নীতির বিষয়ে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং তদন্তে প্রাপ্ত সত্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে যথাযথ আইনগত বিচার নিশ্চিত করা হোক।’
সহকারী শিক্ষিকা স্মৃতি কণা মজুমদার বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক নিয়োগের পর থেকে আজ পর্যন্ত আমরা কোনো ধরনের আর্থিক হিসাব পাইনি। উপবৃত্তির যে অর্থ বিদ্যালয়ে আসে, তা অন্যান্য বিদ্যালয়ে নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষকদের মধ্যে বণ্টন করা হলেও আমাদের বিদ্যালয়ে তা দেওয়া হয় না। আর্থিক হিসাব চাইলে তিনি বিভিন্ন সময়ে আমাদের হুমকি দিয়ে বলেন, এখানে চাকরি না করতে চাইলে অন্য কোথাও চাকরি করতে পারেন।’

