বৃহস্পতিবার, জুলাই ২, ২০২৬

রূপপুরে বালিশ–কাণ্ডের পর নতুন বিস্ফোরণ: ২৭ কোটির যন্ত্রপাতিতে ২১৪ কোটির বিল, সিএজির নিরীক্ষায় ১৮৭ কোটি টাকার অনিয়ম

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বহুল আলোচিত ‘বালিশ–কাণ্ড’-এর পর এবার আবাসন প্রকল্পের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও জেনারেটর কেনাকাটায় নতুন করে বড় ধরনের অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়ের নিরীক্ষায় দেখা গেছে, রূপপুর প্রকল্পের ‘গ্রিন সিটি’ আবাসন এলাকার ১১টি ভবনের বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের সরঞ্জাম ও জেনারেটর ক্রয়ে সরকারি নির্ধারিত দামের তুলনায় প্রায় আট গুণ বেশি অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। নিরীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ২৭ কোটি টাকার যন্ত্রপাতির বিপরীতে বিল পরিশোধ করা হয়েছে ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, ফলে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।

সিএজির নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্ধারিত দর এবং দাপ্তরিক প্রাক্কলনের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি দামে যন্ত্রপাতি ক্রয় করে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থের ক্ষতি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অতিরিক্ত ব্যয় করা অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত আনার সুপারিশ করা হয়েছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের রূপপুর প্রকল্পের আবাসিক ভবন নির্মাণের দায়িত্ব ছিল গণপূর্ত অধিদপ্তরের ওপর। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে পাবনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় ই-জিপি পদ্ধতিতে ১১টি ভবনের বাহ্যিক বিদ্যুতায়নের জন্য দরপত্র আহ্বান করে। এই কাজের আওতায় বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র, জেনারেটর, লিফট, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল, নিরাপত্তা ক্যামেরা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপনের কাজ অন্তর্ভুক্ত ছিল।

নিরীক্ষায় দেখা গেছে, দরপত্রে কৌশলে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের দাম কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেখানো হলেও অন্য কিছু পণ্যের মূল্য কমিয়ে মোট দরকে দাপ্তরিক প্রাক্কলনের কাছাকাছি রাখা হয়। ফলে বাইরে থেকে দরপত্রটি গ্রহণযোগ্য মনে হলেও গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে।

সাত নম্বর ভবনের হিসাব বিশ্লেষণ করে নিরীক্ষকরা দেখতে পান, উচ্চ ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের সরকারি মূল্য যেখানে ছিল মাত্র ১০ লাখ ৩২ হাজার টাকা, সেখানে বিল করা হয়েছে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। একইভাবে একটি বিতরণ ট্রান্সফরমারের সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ৪০ লাখ ৪০ হাজার টাকা, অথচ বিল করা হয়েছে ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। নিম্ন ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের ক্ষেত্রে সরকারি মূল্য প্রায় ১৬ লাখ ৩১ হাজার টাকা হলেও বিল করা হয়েছে ৩ কোটি ২ লাখ টাকা। বিদ্যুতের ক্ষমতাগুণ নিয়ন্ত্রণকারী একটি প্যানেলের সরকারি মূল্য ১০ লাখ টাকারও কম হলেও তার বিপরীতে দেখানো হয়েছে ২ কোটি টাকা। এছাড়া দুটি জেনারেটরের জন্য বিল করা হয়েছে ৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, যদিও সরকারি দরে সেগুলোর মূল্য ছিল প্রায় ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে একটি ভবনেই প্রায় ১৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের তথ্য উঠে এসেছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, পাঁচটি ভবনের কাজ পাওয়া মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেডকে প্রায় ৯২ কোটি টাকা পরিশোধ করা হলেও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ১২ কোটি ২৭ লাখ টাকা। ফলে অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে প্রায় ৭৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। চারটি ভবনের কাজ পাওয়া সাজিন এন্টারপ্রাইজকে দেওয়া হয়েছে ৮২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, যেখানে সরকারি মূল্য ছিল মাত্র ৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এই ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। অন্যদিকে, এমএসসিএল-জিকেবিপিএল যৌথ উদ্যোগকে দুটি ভবনের জন্য ৩৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা পরিশোধ করা হলেও সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এতে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।

সিএজির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দরপত্র মূল্যায়নের সময় অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণের বিষয়ে কোনো কার্যকর যাচাই-বাছাই করা হয়নি। সরকারি ক্রয় বিধিমালা অনুযায়ী কোনো পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেশি হলে দরদাতার কাছ থেকে ব্যাখ্যা চাওয়ার বিধান থাকলেও এ ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি। এমনকি অনুমোদিত প্রাক্কলন কমিটি গঠনেরও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

নিরীক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, কেবল মোট দর প্রাক্কলনের মধ্যে থাকলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের মূল্য যৌক্তিক কি না, সেটিও যাচাই করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেই দায়িত্ব পালন না করায় সরকারের শত শত কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

নথি অনুযায়ী, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি ছিলেন রাজশাহী গণপূর্ত জোনের তৎকালীন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. নজিবর রহমান। সদস্যসচিব ছিলেন পাবনা গণপূর্ত বিভাগের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মাসুদুল আলম। বিল অনুমোদন ও পরিশোধের দায়িত্বেও ছিলেন সংশ্লিষ্ট গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা। উল্লেখ্য, রূপপুর প্রকল্পে আসবাবপত্রসহ অন্যান্য সামগ্রী কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগে এর আগেও মাসুদুল আলম, কয়েকজন ঠিকাদার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ব্যবস্থা নিয়েছিল।

প্রতিবেদনে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য, বিল অনুমোদনকারী এবং বিল পরিশোধকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আপত্তিকৃত ১৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

এদিকে, দেশের সবচেয়ে বড় মেগা প্রকল্পগুলোর একটি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নতুন এই অনিয়মের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান একে ‘মেগা দুর্নীতি’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে এটি বড় ধরনের আর্থিক লুটপাটের ইঙ্গিত বহন করে। তাঁর মতে, দেশে চলমান অন্যান্য মেগা প্রকল্পেও সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় জাতীয় অর্থের অপচয় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর বার্তা দেওয়া সম্ভব হবে না।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ