বৃহস্পতিবার, জুলাই ২, ২০২৬

শাহজালাল বিমানবন্দরে অনুমোদনহীন গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের অভিযোগ, নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা ঘিরে গুরুতর অনিয়ম ও নিরাপত্তা ঝুঁকির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে পাশ কাটিয়ে কাতার এয়ারওয়েজের সঙ্গে একটি বাণিজ্যিক চুক্তির মাধ্যমে গ্রাউন্ড অপারেশনের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করছে গ্যালাক্সি ফ্যাসিলিটেশন সার্ভিসেস লিমিটেড (জিএফএস)। যদিও এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিষ্ঠানটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) অনুমোদন বা লাইসেন্স থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি।

এভিয়েশন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অত্যন্ত সংবেদনশীল ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট একটি কার্যক্রম। এ কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের যথাযথ লাইসেন্স, নিরাপত্তা ছাড়পত্র, প্রশিক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন থাকা বাধ্যতামূলক। অনুমোদনহীন কোনো প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা জাতীয় নিরাপত্তা, যাত্রীসেবা এবং আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং পরিচালনা শুধু আইন লঙ্ঘন নয়, এটি বিমানবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যও হুমকিস্বরূপ।

বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমডোর আবু সাঈদ মেহবুব খান বলেন, প্রচলিত বিধি অনুযায়ী বিদেশি কোনো এয়ারলাইন্সের সঙ্গে সরাসরি গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং চুক্তি করার এখতিয়ার কেবল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের রয়েছে। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তির সুযোগ নেই। তবে রক্ষণাবেক্ষণ বা অন্য কোনো সেবা বিষয়ে পৃথক চুক্তি থাকতে পারে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোশরা ইসলাম বলেন, গত পাঁচ দশক ধরে দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা দিয়ে আসছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এ ধরনের সেবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান দিচ্ছে—এমন তথ্য তার জানা নেই।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কাতার এয়ারওয়েজ বাংলাদেশে তাদের নির্দিষ্ট গ্রাউন্ড অপারেশনে সহায়তার জন্য গ্যালাক্সি ফ্যাসিলিটেশন সার্ভিসেস লিমিটেডের সঙ্গে একটি পাঁচ বছর মেয়াদি চুক্তি করেছে। ১ মে থেকে কার্যকর হওয়া এ চুক্তির মেয়াদ ৩০ এপ্রিল ২০৩০ পর্যন্ত। প্রতিবেদকের হাতে থাকা নয় পৃষ্ঠার চুক্তিপত্রে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ৩০ জন কর্মী সরবরাহ করবে, যারা আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের বিভিন্ন গ্রাউন্ড অপারেশনে দায়িত্ব পালন করবেন।

চুক্তি অনুযায়ী, তাদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে চেক-ইন কাউন্টার প্রস্তুত রাখা, বোর্ডিং পাস ও ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনায় সহায়তা, যাত্রীদের সারিবদ্ধভাবে পরিচালনা, বোর্ডিং গেটে সহায়তা, হ্যান্ড ব্যাগ পরীক্ষা কার্যক্রমে সহযোগিতা, বিমানের কেবিনে ব্যবহৃত কম্বল, বালিশ ও হেডরেস্ট কভার পরিবর্তন, লাগেজ পৃথকীকরণ, কনটেইনারে লোডিং এবং প্রয়োজনে ম্যানুয়ালি লাগেজ স্থানান্তরসহ বিভিন্ন অপারেশনাল কাজ। তবে চুক্তিপত্রে বেবিচকের কোনো অনুমোদন বা লাইসেন্সের উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত গ্যালাক্সি ফ্যাসিলিটেশন সার্ভিসেস লিমিটেড মূলত ভিএফএস গ্লোবালের সহযোগী হিসেবে বিভিন্ন দেশের দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশনের জন্য ভিসা আবেদন গ্রহণ, নথি যাচাই এবং প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করে থাকে। বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রম পরিচালনার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা বা অনুমোদনের তথ্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে বেবিচকের অনুমোদিত গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের তালিকাতেও গ্যালাক্সির নাম নেই।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে গ্যালাক্সি বাংলাদেশ গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ ইউসুফ ওয়ালিদ প্রথমে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং চুক্তির বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরে প্রতিবেদকের কাছে চুক্তিপত্রের কপি থাকার বিষয়টি জানানো হলে সেটিকে ‘ভুল কাগজ’ বলে দাবি করেন। তবে চুক্তির সত্যতা বা বর্তমানে কাতার এয়ারওয়েজের সঙ্গে এ ধরনের কোনো কার্যকর চুক্তি রয়েছে কি না—এ বিষয়ে তিনি সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে একপর্যায়ে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

এ বিষয়ে কাতার এয়ারওয়েজ বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার মুহাম্মদ ই. ইমাম বলেন, মার্চ পর্যন্ত গ্যালাক্সির সঙ্গে যাত্রী ও কার্গো কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জেনারেল সেলস এজেন্ট (জিএসএ) হিসেবে একটি চুক্তি ছিল, যার মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। গ্রাউন্ড সার্ভিসেস-সংক্রান্ত কোনো চুক্তি থাকলে তা সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে যাচাই করতে হবে। তিনি আরও বলেন, যদি বর্তমানে জিএসএ চুক্তি না থাকে, তাহলে প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে তাদের হয়ে কাজ করছে, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।

প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগ, তথ্য ও বক্তব্য সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত বা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে সেটিও যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ