বৃহস্পতিবার, জুলাই ২, ২০২৬

ঘু’ষের বিনিময়ে রাজস্ব ফাঁকির অ’ভিযোগ, পদোন্নতি পেলেন বিআরটিএ যশোর সার্কেলের কর্মকর্তা

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ করতে সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো. হাবিবুর রহমান বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করলেও, আইনের ফাঁকফোকর ও সফটওয়্যারের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত হচ্ছেন। এবার বিআরটিএর যশোর সার্কেলের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. নাহিদুজ্জামানের বিরুদ্ধে ঘুষের বিনিময়ে সরকারের লাখ লাখ টাকার রাজস্ব ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, গত ছয় মাসে এ সার্কেলে ব্যাপক অনিয়ম ও রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও গত ১৬ জুন বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) সচিবালয়ের এক স্মারকের মাধ্যমে তাকে সহকারী পরিচালক (সাধারণ) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ‘খানা জরিপ ২০২৫’-এর তথ্য অনুযায়ী, বিআরটিএতে দুর্নীতির হার ৭৯ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ঘুষের হার ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ। সেবা খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা এই প্রতিষ্ঠানে কীভাবে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে, যশোর সার্কেলের অনুসন্ধানে তার একটি চিত্র উঠে এসেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, যশোর সার্কেলে এ সিন্ডিকেটের অন্যতম সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন কম্পিউটার অপারেটর রফিকুল ইসলাম ওরফে রফিক। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিআরটিএর বৈধ কোনো কর্মচারী নন। এরপরও দীর্ঘদিন ধরে সার্কেলের কম্পিউটার-সংক্রান্ত কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন। অফিসের বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর অফিসিয়াল আইডি ও পাসওয়ার্ডও তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে অভিযোগ। অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রম এবং ঘুষের লেনদেন তার মাধ্যমেই সম্পন্ন হয় বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতি ফাইলে ৫ হাজার টাকা ঘুষের বিনিময়ে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে নিবন্ধনের কাজ সম্পন্ন করা হতো।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে মোটরসাইকেল নিবন্ধন ফি বাড়িয়ে ১১ হাজার ৭৬৪ টাকা নির্ধারণ করে সরকার। এর আগে এ ফি ছিল ১০ হাজার ১৫২ টাকা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সফটওয়্যারের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে ২০২৩ সালের আগের ১০ হাজার ১৫২ টাকার ব্যাংক চালান ব্যবহার করে ২০২৬ সালেও মোটরসাইকেলের নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে।

অনুসন্ধানে অভিযোগ করা হয়েছে, এভাবে বর্ধিত ১ হাজার ৬১২ টাকা সরকারি ফি আদায় না করেই শতাধিক মোটরসাইকেলের নিবন্ধন সম্পন্ন করা হয়েছে। এতে সরকারের প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার ২০০ টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

এছাড়া মোটরসাইকেলের মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে, একটি নির্দিষ্ট চ্যাসিস নম্বরের মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে ২০১৮ সালে একজন ব্যক্তি ব্যাংক ফি জমা দিলেও ২০২৫ সালে যথাযথ মালিকানা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে অন্য ব্যক্তির নামে সরাসরি নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে।

প্রচলিত বিধিমালা অনুযায়ী, আবেদনকারী ও ফি জমাদানকারী ব্যক্তি ভিন্ন হলে প্রথমে মূল মালিকের নামে নিবন্ধন সম্পন্ন করে পরে মালিকানা পরিবর্তন করতে হয় অথবা প্রয়োজনীয় হলফনামা ও নির্ধারিত সরকারি ফি জমা দিয়ে নতুন মালিকের নামে নিবন্ধন দেওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে ট্রান্সফার ফি, পরিদর্শন ফি, ভ্যাট, ডুপ্লিকেট ও ডিজিটাল সার্টিফিকেটসহ মোট ৪ হাজার ৮৪০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে।

তবে অভিযোগ রয়েছে, নাহিদুজ্জামান ও রফিকের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট ৫ হাজার টাকা ঘুষের বিনিময়ে কোনো ধরনের মালিকানা পরিবর্তন ফি এবং প্রয়োজনীয় নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ছাড়াই অন্তত ৫০টি মোটরসাইকেল অন্য ব্যক্তির নামে নিবন্ধন করে দিয়েছে।

অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, এতে মালিকানা পরিবর্তন ফি বাবদ ২ লাখ ৪২ হাজার টাকা এবং স্ট্যাম্প বাবদ আরও ৪০ হাজার টাকাসহ মোট ২ লাখ ৮২ হাজার টাকার সরকারি রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিআরটিএর একজন পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) বলেন, আবেদন গ্রহণের সময় নির্ধারিত সরকারি ফি আদায় এবং আবেদনকারী ও ফি জমাদানকারীর নামে অমিল থাকলে মালিকানা পরিবর্তনের ফি নেওয়া বাধ্যতামূলক। এর ব্যত্যয় ঘটলে তা সরাসরি সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের শামিল।

সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী, এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরকারি দায়িত্বে অবহেলা ও অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হতে পারে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাময়িক বরখাস্ত, বিভাগীয় মামলা, ইনক্রিমেন্ট স্থগিত, পদাবনতি কিংবা চাকরিচ্যুতির মতো শাস্তির বিধান রয়েছে।

এছাড়া দুদক আইন, ২০০৪ এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ অনুযায়ী, ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অবৈধ সুবিধা নিশ্চিত করা এবং সরকারি আর্থিক বিধিমালা (জেনারেল ফিন্যান্সিয়াল রুলস) লঙ্ঘনের বিষয়টি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারে।

তবে এই প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে মো. নাহিদুজ্জামানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

প্রতিবেদনে উল্লেখিত অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য এবং বিভিন্ন সূত্রের বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা সিদ্ধান্ত হলে সেটিও যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ