Thursday, August 27, 2026

৮৮৪ কোটি টাকার রেল প্রকল্পে পছন্দের ঠিকাদারকে সুবিধা দিতে প্যাকেজ তৈরির অভিযোগ

বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের ট্র্যাক রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন প্রকল্পে প্রায় ৮৮৪ কোটি টাকার কাজের টেন্ডার প্যাকেজ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পের কাজগুলো এমনভাবে বড় বড় প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছে, যাতে হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য ঠিকাদারদের দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।

সংশ্লিষ্ট খাতের একাধিক ঠিকাদারের দাবি, অতীতে ট্র্যাক মেরামত ও পুনর্বাসনের কাজ ২ থেকে ৫ কিংবা ৭ কোটি টাকার ছোট প্যাকেজে দেওয়া হলেও এবার বিভিন্ন এলাকার কাজ একত্র করে বড় আকারের প্যাকেজ তৈরি করা হয়েছে। ফলে বড় কাজের অভিজ্ঞতা ও আর্থিক সক্ষমতার শর্ত পূরণ করতে না পারায় ছোট ও মাঝারি ঠিকাদাররা প্রতিযোগিতা থেকে কার্যত বাদ পড়ছেন।

তাদের অভিযোগ, এতে দরপত্রে প্রতিযোগিতা কমে গিয়ে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

আটটি প্যাকেজে ৮৮৩ কোটি ৭২ লাখ টাকার কাজ

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, সরঞ্জামসহ প্রায় ১ হাজার ৭৬১ কোটি টাকার ট্র্যাক রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় ট্র্যাক-সংক্রান্ত কাজের জন্য ৮৮৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় অনুমোদন দেওয়া হয় ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই। এই কাজগুলো মোট আটটি প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছে।

প্যাকেজগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • চট্টগ্রামের ষোলশহর-ফতেয়াবাদ-নাজিরহাট এবং ফতেয়াবাদ-চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অংশে প্রায় ৫৮ কোটি ৯০ লাখ ৬৪ হাজার টাকা

  • লাকসাম-নোয়াখালী সেকশনে ৪৬ কোটি ৩০ লাখ ৯ হাজার টাকা

  • জয়দেবপুর-শ্রীপুর অংশে ৩৯ কোটি ৭৬ লাখ ২৮ হাজার টাকা

  • ময়মনসিংহ-বেগুনবাড়ি, ময়মনসিংহ-মোহনগঞ্জ, শ্যামগঞ্জ জংশন-জারিয়া জাঞ্জাইল ও গৌরীপুর-ময়মনসিংহ জংশন-আঠারোবাড়ী অংশে ২৩৫ কোটি ৬ লাখ ১৭ হাজার টাকা

  • বেগুনবাড়ী-দেওয়ানগঞ্জ বাজার, জগন্নাথগঞ্জ ঘাট-তারাকান্দি এবং তারাকান্দি-বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব অংশে ২০০ কোটি ২২ লাখ ৬০ হাজার টাকা

  • ভৈরব বাজার জংশন-আঠারোবাড়ী অংশে ৫৩ কোটি ৬৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা

  • আখাউড়া-সাটিয়াজুরী অংশে ৫৯ কোটি ২৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা

  • সিলেট-সাটিয়াজুরী অংশে ১৯০ কোটি ৫৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা

ছোট ও মাঝারি ঠিকাদারদের অংশগ্রহণে সংকটের অভিযোগ

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ট্র্যাক রক্ষণাবেক্ষণ খাতের একাধিক ঠিকাদার জানান, বড় প্যাকেজের কারণে স্থানীয় এবং ছোট-মাঝারি ঠিকাদারদের অংশগ্রহণের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

তাদের ভাষ্য, আগে একই ধরনের কাজ ছোট ছোট প্যাকেজে ভাগ করে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করা হতো। কিন্তু এবার বিভিন্ন এলাকার কাজ একত্র করে বড় প্যাকেজ করায় নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্যদের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

একজন ঠিকাদার বলেন, কাজের পরিধি অনুযায়ী মাত্র দুই থেকে চারটি প্রতিষ্ঠানের এসব প্যাকেজে অংশ নেওয়ার মতো যোগ্যতা রয়েছে। প্রতিযোগিতা সীমিত হলে স্বাভাবিকভাবেই দরপত্রের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো নথি বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সীমিত দরদাতা নিয়ে প্রশ্ন

রেলের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সম্প্রতি আহ্বান করা দুটি টেন্ডারে খুবই সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে।

তাদের দাবি, ২৩৫ কোটি টাকার একটি প্যাকেজে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিয়েছে। অন্যদিকে ৩৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকার আরেকটি প্যাকেজে দুটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে।

কর্মকর্তাদের অভিযোগ, একক দরদাতা থাকা সত্ত্বেও ওই প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় রয়েছে। তবে দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।

রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও তুললেন ঠিকাদাররা

কয়েকজন ঠিকাদার অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যারা রেলওয়ের বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যবসায়িক সুবিধা পেয়েছিলেন, তাদের একটি অংশ এখনও বিভিন্ন কাজ পাওয়ার চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত অনেক ঠিকাদার অতীতে রাজনৈতিক হয়রানি ও মামলা-মোকদ্দমার কারণে ব্যবসায়িকভাবে পিছিয়ে পড়েছেন বলেও তারা দাবি করেন।

তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব বা দুর্নীতির অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

প্যাকেজ ছোট করার দাবি, রেলওয়ের ব্যাখ্যা

সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের দাবি, বড় প্যাকেজ ভেঙে ছোট ছোট প্যাকেজে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হলে প্রতিযোগিতা বাড়বে। এতে অধিকসংখ্যক যোগ্য ঠিকাদার অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন এবং সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ সাশ্রয় নিশ্চিত হবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী এবং ট্র্যাক রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. তানভীরুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পটি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেওয়া হলেও চূড়ান্ত অনুমোদন হয়েছে ২০২৫ সালে। কাজের পরিধি বড় হওয়ায় প্রতিযোগিতা কম হয়েছে।

তিনি জানান, ২০০ কোটি ও ১৯০ কোটি টাকার দুটি বড় প্যাকেজ ইতোমধ্যে ভেঙে অতিরিক্ত দুটি প্যাকেজ করা হয়েছে।

তানভীরুল ইসলাম আরও বলেন, যদি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কোনো সমস্যা থেকে থাকে, তাহলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে প্যাকেজ আরও ছোট করার সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে পিপিআর-২০২৫ অনুসরণ করেই দরপত্র প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী টেন্ডার বাতিল বা সংশোধন করা হবে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ