
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরিবিধি উপেক্ষা করে আউটসোর্সিং ব্যবসা পরিচালনা, জনবল সরবরাহ, পদোন্নতি ও পদায়নে অনিয়ম এবং ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, নিজের সরকারি পদ ও প্রভাব ব্যবহার করে তিনি এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্প ও দপ্তরের জনবল নিয়োগ এবং পদায়নে প্রভাব বিস্তার করেছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, বেলাল হোসেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় থেকেই বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তীতে প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব নেওয়ার পর তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পরিমাণ আরও বেড়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নিজের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জনবল সরবরাহের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, এলজিইডির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমবায় সমিতি এলকেএসএস হিউম্যান রিসোর্স সেন্টারকে ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রকল্পে জনবল সরবরাহের ব্যবসা পরিচালনা করা হয়েছে। জনবল সরবরাহের জন্য কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের নির্ধারিত ‘জি’ শ্রেণির লাইসেন্স প্রয়োজন হলেও প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ সময় শুধু ট্রেড লাইসেন্সের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২২, ২০২৩, ২০২৪, ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাস পর্যন্ত এলকেএসএস হিউম্যান রিসোর্স সেন্টারের ট্রেড লাইসেন্সের একক মালিক হিসেবে মো. বেলাল হোসেনের নাম ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রেড লাইসেন্স নম্বর হিসেবে রাড/ডিএনসিসি/০০৩৬০৭/২০২১ উল্লেখ করা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর অনুসন্ধান করে। গত ২৩ জুন ২০২৬ যুগ্ম মহাপরিদর্শক মো. মাহফুজুর রহমান ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বেলাল হোসেনের কাছে সরকারি কর্মচারী হিসেবে ব্যবসা পরিচালনার বৈধতা এবং প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা পরিবর্তনের বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে অবহিত না করার কারণ জানতে চাওয়া হয়।
টিন-ভ্যাট ও কর্মীদের অর্থ নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগ রয়েছে, এলকেএসএসের মাধ্যমে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ জন জনবল বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসব কর্মীর বেতন থেকে নিয়ম অনুযায়ী টিন ও ভ্যাট বাবদ অর্থ কর্তন করা হলেও তার একটি অংশ সরকারি কোষাগারে জমা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া আউটসোর্সিং কর্মীদের বেতন থেকে প্রতিবছর এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ কর্তনের নিয়ম রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। চাকরির মেয়াদ শেষে ওই অর্থ কর্মীদের ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত অনেক কর্মী তা পাননি বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩০ কোটি টাকা হতে পারে। এর সিংহভাগ অর্থ বেলাল হোসেনের নিয়ন্ত্রণে গেছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অর্থের সঠিক পরিমাণ ও ব্যবহারের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নিয়োগদাতা ও টেন্ডার বাছাইকারী একই ব্যক্তি—এমন অভিযোগ
বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো—তিনি একই সঙ্গে এলকেএসএস হিউম্যান রিসোর্স সেন্টারের একক মালিক, সরকারি কর্মকর্তা এবং তার অধীনস্থ প্রকল্পে জনবল নিয়োগের টেন্ডার বাছাই কমিটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও কাগজপত্র না থাকা প্রতিষ্ঠানকেও প্রভাব খাটিয়ে জনবল সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এভাবে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ জনকে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া এলকেএসএস হিউম্যান রিসোর্স সেন্টারের পরিবর্তে ‘এলকেএসএস এইচআরসি’ নামে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ট্রেড লাইসেন্সে প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ নামের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত নাম উল্লেখ না থাকায় ওই নামে দেওয়া কার্যাদেশের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
পদোন্নতিতে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ
প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব নেওয়ার পর বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে শত শত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত ও চলতি দায়িত্ব দিয়ে পদায়নের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কয়েকজন কর্মকর্তার নিয়োগ অবৈধ ও প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় তাদের পদোন্নতি না দেওয়ার সুপারিশ করে একটি তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দিয়েছিল। ওই কমিটির সদস্য ছিলেন বেলাল হোসেন নিজেও এবং প্রতিবেদনে তার স্বাক্ষর ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু পরবর্তীতে প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব নেওয়ার পর একই কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ক্ষেত্রে সহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতির সময় ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা এবং নির্বাহী প্রকৌশলী পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার সময় গড়ে ১০ লাখ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
আরও অভিযোগ করা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীর পদায়নে ৩০ থেকে ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ২৫ থেকে ৩০ জনকে নির্বাহী প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বে পদায়ন করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
‘ওহাব গ্রুপ’কে পদোন্নতির অভিযোগ
বেলাল হোসেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) থাকাকালে ‘ওহাব গ্রুপ’ নামে পরিচিত ১১ জনকে আদালতের রায়ের ব্যাখ্যা ব্যবহার করে উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ওই গ্রুপের কয়েকজন কম্পিউটার অপারেটর ও স্টোরকিপারকে সরকারি চাকরিবিধি উপেক্ষা করে উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। আদালতের নির্দেশ না থাকা সত্ত্বেও ২০০৬ সাল থেকে তাদের বকেয়া বা এরিয়ারসহ বিভিন্ন পাওনা বাবদ প্রায় ৬ কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে প্রত্যেকের কাছ থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকা করে ঘুষ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা নথি প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।
১৩০ কর্মকর্তার পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন
সম্প্রতি প্রায় ১৩০ জনকে সহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়ার ঘটনায়ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তাদের কাছ থেকে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা করে ঘুষ নেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রকৌশলীর অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রেও ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এলজিইডির পদোন্নতি বিধিমালা অনুযায়ী শূন্য পদের একটি অংশ বিভাগীয় পরীক্ষার মাধ্যমে এবং বাকি পদ সরকারি কর্ম কমিশনের মাধ্যমে পূরণের বিধান থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, মাত্র ৬০ থেকে ৬৫টি শূন্য পদের বিপরীতে প্রায় ১৬০ জনকে সহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়ার প্রক্রিয়া নেওয়া হয়েছে।
বিভাগীয় পরীক্ষায় সবাই উত্তীর্ণ হওয়ার অভিযোগ
সার্ভেয়ার ও কার্যসহকারী পদ থেকে উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতির জন্য সম্প্রতি বিভাগীয় পরীক্ষা নেওয়া হয়। প্রায় ৯৫০ জন আবেদন করলেও পরীক্ষায় অংশ নেন প্রায় ৮৯০ জন। অভিযোগকারীদের দাবি, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রায় সবাইকে উত্তীর্ণ দেখানো হয়েছে।
পরবর্তীতে সিনিয়রিটি ও পরীক্ষার নম্বরের ভিত্তিতে পদোন্নতির তালিকা না করে সবার তথ্য চাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেকের কাছ থেকে প্রায় ৫ লাখ টাকা করে দাবি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এলজিইডি প্রশাসনের তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, প্রায় ২০০ জনকে উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘুষ লেনদেনের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
চাকরি স্থায়ী করার ক্ষেত্রেও ঘুষের অভিযোগ
এলজিইডির বিভিন্ন কার্যালয়ে কর্মরত কার্যভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত এবং আদালতের রায় পাওয়া কর্মীদের চাকরি স্থায়ী করার বিষয়েও সম্প্রতি বৈঠক হয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ওই বৈঠকে চাকরি স্থায়ীকরণের বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে বৈঠকে ঘুষের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে—এমন দাবির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আগেও বিভিন্ন অভিযোগে সংবাদ প্রকাশ
বেলাল হোসেনকে নিয়ে এর আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগসংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এসব প্রতিবেদনে নির্বাহী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী ও উপ-সহকারী প্রকৌশলীদের পদায়ন এবং বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও উঠে এসেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব অনিয়মের কারণে দেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সংস্থা এলজিইডির প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারা প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা আউটসোর্সিং ব্যবসা, পদোন্নতি, পদায়ন ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত ঘটনা ও দায় নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।

