Wednesday, August 26, 2026

ভোলায় ৬ হাজার টাকায় পরীক্ষা ছাড়াই ভারী ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার অভিযোগ

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নিয়ম অনুযায়ী, ভারী মোটরযানের ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে সংশ্লিষ্ট শ্রেণির যানবাহনেই পরীক্ষায় অংশ নেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে ভোলা সার্কেলে এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ঘুষের বিনিময়ে ভারী যানবাহনের লাইসেন্স দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সংস্থাটির মোটরযান পরিদর্শক আবু পলাশের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রাইভেটকারের মতো হালকা যানবাহন চালকদের কাছ থেকে ৬ হাজার টাকা করে ‘স্পিডমানি’ নিয়ে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও বাসের মতো ভারী যানবাহন চালানোর লাইসেন্স দেওয়ার ব্যবস্থা করছেন তিনি। এতে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা ছাড়াই অনেকে ভারী যানবাহন চালানোর বৈধতা পাচ্ছেন বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

পরীক্ষায় অকৃতকার্য ১৩৯, উত্তীর্ণ ৩৯

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ আগস্ট ভোলা সার্কেলে ভারী যানবাহনের ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষায় ১৭৮ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন। এর মধ্যে ১৩৯ জন অকৃতকার্য হলেও উত্তীর্ণ হন ৩৯ জন।

পরীক্ষার্থী ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, উত্তীর্ণদের অনেকেই বাস্তবে কোনো ভারী যানবাহন চালানোর অভিজ্ঞতা ছাড়াই শুধু প্রাইভেটকার চালিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেন। তাদের মধ্যে লার্নার নম্বর 32-18491882, 32-18492535, 32-18492540, 32-18495156, 32-18496425, 32-18496783, 32-18496833, 32-18499139, 32-17372063 ও 32-18580198—এই ১০ জনের নাম রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, একইভাবে বিভিন্ন দিনে আরও একাধিক ব্যক্তিকে ভারী যানবাহনের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।

২৮ জুলাই লার্নার নম্বর 32-18486539, 32-18249198, 32-17721515, 32-17606950, 32-17344748, 32-18307074, 32-18318440 ও 32-18143209-সহ মোট আটজনকে লাইসেন্স দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

২১ জুলাই লার্নার নম্বর 32-18456156, 32-18458419, 32-18470065, 32-18470786, 32-18471407, 32-18472632, 32-18275545, 32-18476569, 32-18479399, 32-17840104, 32-18292889, 32-18317384, 32-17873981 ও 32-18555390-সহ ১৪ জনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

এ ছাড়া ৩০ জুন লার্নার নম্বর 32-18382980, 32-18384274, 32-18390744, 32-18226302 ও 32-17407706-সহ বিভিন্ন দিনে মোট ৩৭ জনকে একই প্রক্রিয়ায় ভারী যানবাহনের লাইসেন্স দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

দালাল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ

অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে, মোটরযান পরিদর্শক আবু পলাশ বিভিন্ন কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনকালে দালালদের মাধ্যমে ঘুষ লেনদেনের একটি সিন্ডিকেট পরিচালনা করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁর ভাই বিপুলও এই লেনদেনের বিষয়টি দেখভালে যুক্ত রয়েছেন।

এর আগে ২০২৩ সালে শেরপুর সার্কেলে দায়িত্ব পালনকালে ঘুষ না দেওয়ায় যোগ্য চালকদেরও অকৃতকার্য করানোর অভিযোগ উঠেছিল আবু পলাশের বিরুদ্ধে। ওই বছরের ২ মে একটি বেসরকারি টেলিভিশনে ‘শেরপুর বিআরটিএ ফের দুর্নীতির আখড়া’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর পরদিন, ৪ মে তৎকালীন সহকারী পরিচালকের সুপারিশের ভিত্তিতে তাঁকে বিআরটিএ সদর কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সদর কার্যালয়ে বদলি হওয়ার পরও তিনি প্রশাসন শাখায় প্রভাব বিস্তার করে ‘লাভজনক’ সার্কেলে পদায়নের চেষ্টা চালান বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০২৪ সালের ১৯ মার্চ তাঁকে সিরাজগঞ্জ সার্কেলে বদলি করা হয়। তবে সেখানে আর্থিক সুবিধার সুযোগ কম থাকায় তিনি যোগদান করেননি এবং পরে তদবিরের মাধ্যমে ওই বদলির আদেশ বাতিল করান বলে অভিযোগ রয়েছে।

এর প্রায় ৪০ দিন পর তাঁকে ফরিদপুর সার্কেলে বদলি করা হলেও ২০২৪ সালের ২ মে ‘প্যাসেঞ্জার ভয়েস’ পত্রিকায় তাঁকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সেই আদেশও বাতিল হয় বলে জানা গেছে।

সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১ মার্চ বিআরটিএর উপপরিচালক (প্রশাসন) তানভীর আহমেদ সিদ্দিকীর স্বাক্ষরিত এক আদেশে আবু পলাশকে ঢাকার সদর কার্যালয় থেকে ভোলা সার্কেলে বদলি করা হয়। ওই আদেশের স্মারক নম্বর ৩৫.০৩.০০০০.০০০.০০১.১৯.০১০৮.২৫-৪২৪।

‘অদক্ষ চালকদের লাইসেন্স দেওয়ায় বাড়ছে ঝুঁকি’

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা যাচাই না করে ঘুষের বিনিময়ে অদক্ষ ও অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের ভারী যানবাহনের লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে এবং যোগ্য ও দক্ষ চালকরা প্রতিযোগিতায় বঞ্চিত হচ্ছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআরটিএর একজন পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) বলেন, আবু পলাশের বিরুদ্ধে একাধিকবার দুর্নীতির অভিযোগ ও প্রমাণ পাওয়া গেলেও প্রশাসন শাখার কিছু কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করে তিনি বারবার মাঠপর্যায়ের সার্কেল অফিসে পদায়ন পাচ্ছেন।

ওই কর্মকর্তা মনে করেন, তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের সার্কেল অফিসে পদায়ন বন্ধ রাখার বিষয়টিও বিবেচনা করা উচিত।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ