
কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ধামতী (দক্ষিণ) ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নায়েব ফিরোজ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, সেবাপ্রার্থীদের কাছ থেকে ঘুষ আদায় এবং অফিসের কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় তিন মাস আগে ওই অফিসে যোগদানের পর থেকেই নিজের প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, যোগদানের পর অফিসের সম্মিলিত কর্মপরিসরের মধ্যে নিজের জন্য আলাদা কক্ষ তৈরি করে নিয়েছেন ফিরোজ ভূঁইয়া। এর আগেও তিনি যেসব কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানেও একই ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ছিল বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
ধামতী (দক্ষিণ) ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বর্তমানে নায়েব ফিরোজ ভূঁইয়া, অফিস সহায়ক নূরুল ইসলাম, অফিস সহায়ক বকুল আক্তার এবং ঝাড়ুদার হিমান শো চন্দ্রদাস—এই চারজন কর্মরত রয়েছেন।
তবে অফিসের কার্যক্রম নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে ঝাড়ুদার হিমান শো চন্দ্রদাসকে দিয়ে অনলাইন ভূমিসেবা সংক্রান্ত কাজ করানোর অভিযোগে। স্থানীয়দের দাবি, দায়িত্বের বাইরে গিয়ে তাকে কম্পিউটারে জমির নামজারি ও খারিজের কাজ করতে দেখা গেছে। এতে সরকারি ভূমি সার্ভারে অননুমোদিত ব্যক্তির প্রবেশাধিকার এবং তথ্যের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, হিমান শো চন্দ্রদাস বিভিন্ন সময়ে ভূমিসেবা নিতে আসা ব্যক্তিদের সঙ্গে জমির নামজারি ও খারিজের বিষয়ে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে কাজ করে দেন। তার বিরুদ্ধে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে খাজনা ও খারিজের কাজ সম্পন্ন করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, জমির খারিজের জন্য তাদের কাছ থেকে ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। আবার জমি নিয়ে জটিলতা থাকলে সেই অর্থের পরিমাণ আরও বেড়ে লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছায় বলেও দাবি করেছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা রশিদ, কালাম ও রফিকুলের অভিযোগ, ফিরোজ ভূঁইয়া যোগদানের পর থেকেই ভূমি অফিসে এ ধরনের আর্থিক লেনদেনের প্রবণতা বেড়েছে। তাদের দাবি, নায়েব নিজে সরাসরি এসব লেনদেন না করে অফিস সহায়ক ও ঝাড়ুদারদের মাধ্যমে সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সেবাপ্রার্থী জানান, তারা ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত চুক্তির মাধ্যমে জমির খারিজ করিয়েছেন। নাম প্রকাশ করলে পরবর্তী সময়ে তাদের ভূমিসেবা পেতে সমস্যা হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে তারা পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।
অভিযোগের বিষয়ে নায়েব ফিরোজ ভূঁইয়ার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি কুমিল্লার কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে নিজের ঘনিষ্ঠতার কথা উল্লেখ করেন এবং তাদের কাছের মানুষ ও বন্ধু হিসেবে পরিচয় দেন বলে অভিযোগ করেছেন প্রতিবেদক। স্থানীয়দের দাবি, এভাবে তিনি সাংবাদিকদের প্রভাবের কথা বলে অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
এদিকে, ধামতী ইউনিয়নের পার্শ্ববর্তী আসাদনগর এলাকায় ফিরোজ ভূঁইয়ার বাড়ি হওয়ায় স্থানীয় পর্যায়েও তার প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন বাসিন্দা। তারা বলছেন, স্থানীয় পরিচিতি ও পারিবারিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি কর্মস্থলে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অফিসে কর্মরত অবস্থায় নায়েব ফিরোজ ভূঁইয়ার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি কচি ডাব ও তাজা সবজি নিয়ে আসছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব পণ্য তার ব্যক্তিগত প্রয়োজনের জন্য সংগ্রহ করা হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া ভূমি তহসিলদার সমিতির সদস্য হওয়ার পরও ফিরোজ ভূঁইয়া সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে চেনেন না বা সংগঠনের কার্যক্রমে ভোট দেন না—এমন অভিযোগও করেছেন কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। তাদের দাবি, নিজের প্রভাব ও ক্ষমতার কারণে তিনি সংগঠনের নিয়ম-কানুনকে গুরুত্ব দেন না।
ফিরোজ ভূঁইয়া দেবিদ্বার উপজেলার আসাদনগর এলাকার আব্দুল রশিদ ভূঁইয়ার ছেলে। কর্মস্থলের কাছাকাছি তার বাড়ি হওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে তার প্রভাব আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার অভিযোগগুলোর স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ভূমি প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

