Tuesday, August 25, 2026

সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে বদলি বাণিজ্য ও অ’বৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ

খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রার ও বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (বিআরএসএ) মহাসচিব মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে বদলি বাণিজ্য, ঘুষ লেনদেন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধভাবে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিআরএসএর মহাসচিব পদকে ব্যবহার করে তিনি সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি ও পদায়নে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মাইকেল মহিউদ্দিন বর্তমানে রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করে বিএনপিপন্থী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করছেন। তবে সরকার পরিবর্তনের পরও তার প্রভাব কমেনি। বরং বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে তিনি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত ২৩ আগস্ট নবাবগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রার নাজমুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যসংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর ওই প্রতিবেদককে ফোন করে মাইকেল মহিউদ্দিন হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। লিখিত অভিযোগ পেলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশ্বস্ত করেছেন বলে জানা গেছে।

সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি নিয়ে অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট একাধিক সাব-রেজিস্ট্রারের দাবি, মাইকেল মহিউদ্দিন বিআরএসএর মহাসচিবের পদকে প্রভাবের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে অনৈতিক সুবিধা নেওয়া এবং পছন্দের স্থানে পোস্টিং পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরত থাকার সময়ও তিনি প্রভাব খাটিয়ে অনিয়ম করেছেন। এর আগে তিনি ঢাকার সাভার ও টঙ্গী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। এসব পদে থাকা অবস্থায় ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জন করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন সাব-রেজিস্ট্রার জানান, বিআরএসএর সাংগঠনিক ক্ষমতার কথা উল্লেখ করে সাধারণ সাব-রেজিস্ট্রারদের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে মাইকেল মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে।

রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তনের পরও প্রভাব

তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২৯তম বিসিএসের নন-ক্যাডার থেকে সাব-রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ পান মাইকেল মহিউদ্দিন। তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার কারণে তিনি দ্রুত সংশ্লিষ্ট সেক্টরে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, সাবেক আইনমন্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পদায়নের ক্ষেত্রে তিনি প্রভাব বিস্তার করতেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তার সেই প্রভাব অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশের ২৮৬ জন সাব-রেজিস্ট্রারকে বদলি করা হয়। এসব বদলির একটি বড় অংশে অনিয়ম ও অর্থ লেনদেন হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

বিআরএসএর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন

মাইকেল মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, নিয়মিত নির্বাচন ছাড়াই নিজস্ব অনুসারী সাব-রেজিস্ট্রারদের নিয়ে বিআরএসএর নেতৃত্ব গ্রহণ করেছেন তিনি। সংগঠনের মহাসচিবের পদ ব্যবহার করে তিনি বদলি ও পদায়নে প্রভাব বিস্তার করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল নিবন্ধন কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব চেয়ে ১০ দিনের সময় বেঁধে দেওয়ার পর সংগঠনের পক্ষ থেকে সচিবালয়ে বিক্ষোভের ঘটনাতেও মাইকেলের নেতৃত্বের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই সময় প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল।

২০২৫-২৬ মেয়াদের বিআরএসএর কমিটির কয়েকজন সদস্য নিয়ম ভেঙে অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক কর্মস্থলে পদায়ন পেয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন দায়িত্ব গ্রহণের অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন কর্মস্থলে বদলি হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

অভিযোগ রয়েছে, কমিটির যুগ্ম মহাসচিব গোলাম মোস্তফা চুয়াডাঙ্গা থেকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় বদলি হন। যুগ্ম মহাসচিব জাহাঙ্গীর আলম শেরপুরে কয়েক মাস দায়িত্ব পালনের পর বাড্ডায় বদলি হন। সাংগঠনিক সম্পাদক মামুন বাবর মিরোজ মানিকগঞ্জের সিংগাইর থেকে ঢাকার কেরানীগঞ্জে এবং আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আব্দুল বাতেন নবাবগঞ্জ থেকে গাজীপুর সদরে বদলি হন। এসব বদলিতে সংগঠনের প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।

সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ

মাইকেল মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে দেওয়া একটি অভিযোগে ঢাকার আফতাবনগরে ২৯টি ফ্ল্যাট, গুলশান, বসুন্ধরা, নিকেতন, বনশ্রী, পান্থপথ, পূর্বাচল ও রূপগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় সম্পদ থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, গুলশান-১, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা ও পূর্বাচলে তার এবং তার স্বজনদের নামে একাধিক সম্পত্তি রয়েছে। ঢাকার বাইরে নিজ জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে প্রায় ১০০ বিঘা কৃষিজমি, মাছের ঘের ও ইটভাটা থাকারও অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া তার স্ত্রী জান্নাত নীলার নামে এবং শ্যালক, বোন ও অন্যান্য স্বজনের নামে বিভিন্ন সম্পত্তি থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা ও অর্থের উৎস তদন্ত করা হলে মাইকেল মহিউদ্দিনের সম্পদ অর্জনের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

তবে এসব সম্পদের মালিকানা, মূল্য ও অর্থের উৎস সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি।

দুদকে অভিযোগ

মাইকেল মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে বদলি বাণিজ্য ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ জমা পড়েছে বলে জানা গেছে। গত ১৩ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রাফসান আল আলভী শত কোটি টাকার বদলি বাণিজ্য ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তুলে তদন্তের দাবি জানান।

দুদক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, অভিযোগটি প্রাথমিকভাবে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের অবস্থান

আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি ও পদায়নে অতীতে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিবন্ধন খাতের বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানা গেছে।

মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদনের সময় তা পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলো তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হলে তার দায় নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ