Wednesday, August 12, 2026

৩ লাখের মেরামত ২৪ লাখে, ৩৩ শ্রমিকের মজুরি কাটার অ’ভিযোগ বিআরটিসি ডিপোতে

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) জোয়ার সাহারা বাস ডিপোতে দৈনিকভিত্তিক সাময়িক শ্রমিকদের নির্ধারিত মজুরি থেকে টাকা কেটে নেওয়া এবং বাস মেরামতের নামে অতিরিক্ত অর্থ দেখিয়ে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ডিপো ম্যানেজার মো. মফিজ উদ্দিন।

অভিযোগ অনুযায়ী, বিআরটিসির প্রধান কার্যালয়ের নির্ধারিত মজুরি কাঠামো ও নির্দেশনা উপেক্ষা করে জোয়ার সাহারা ডিপোর ৩৩ জন সাময়িক কারিগরকে দৈনিক ৭০০ টাকার পরিবর্তে ৬০০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ প্রত্যেক শ্রমিকের দৈনিক মজুরি থেকে ১০০ টাকা করে কম দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

৩৩ শ্রমিকের মজুরি থেকে বছরে প্রায় ১২ লাখ টাকা কম দেওয়ার অভিযোগ

বিআরটিসির প্রধান কার্যালয়ের হিসাব বিভাগ (পে-রোল) থেকে অতিরিক্ত সচিব ও চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লার নামে জারি করা একটি অফিস আদেশে মার্চ ২০২৬ থেকে সাময়িক কারিগরদের দৈনিক মজুরি ৭০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। একই আদেশে মজুরি অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিশোধের নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

তবে অভিযোগ রয়েছে, জোয়ার সাহারা ডিপোতে ৩৩ জন কারিগরকে দীর্ঘদিন ধরে নির্ধারিত ৭০০ টাকার পরিবর্তে ৬০০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে।

হিসাব অনুযায়ী, ৩৩ জন শ্রমিকের কাছ থেকে প্রতিদিন মোট ৩ হাজার ৩০০ টাকা কম দেওয়া হয়। মাসে এ অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৯৯ হাজার টাকা এবং বছরে প্রায় ১১ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। ফলে নির্ধারিত মজুরি থেকে শ্রমিকদের বঞ্চিত করা হলে বছরে প্রায় ১২ লাখ টাকা কম পরিশোধের বিষয়টি সামনে আসে।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে প্রতিদিনের প্রাপ্য মজুরি থেকে ১০০ টাকা কম পাওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

মজুরি কর্তনের বিষয়ে ম্যানেজারের বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক

মজুরি কর্তনের অভিযোগের বিষয়ে ডিপো ম্যানেজার মো. মফিজ উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। এ সময় তার একটি বক্তব্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, “এই টাকা কি আমি একা খাই? চেয়ারম্যানকে দিয়ে খাই।”

তবে ম্যানেজারের এই বক্তব্যের সত্যতা বা এর মাধ্যমে তিনি কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

পরে ডিপোর ট্রাফিক অফিসার মো. তালেব বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “স্যারের মাথা ঠিক ছিল না, তাই এমন কথা বলেছেন।”

তবে ম্যানেজারের বক্তব্যের বিষয়ে বিআরটিসি চেয়ারম্যান বা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

৩ লাখ টাকার মেরামত ২৪ লাখে দেখানোর অভিযোগ

শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে অভিযোগের পাশাপাশি জোয়ার সাহারা ডিপোর গাড়ি মেরামত খাতেও বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, বিআরটিসির প্রধান কার্যালয় থেকে ডিপোর একটি বাস মেরামতের জন্য প্রাথমিকভাবে ৩ লাখ টাকা অনুমোদন দেওয়া হয়। পরবর্তীতে একই গাড়ির মেরামত ব্যয় ২৪ লাখ টাকা দেখিয়ে ভাউচার ও প্রস্তাবনা তৈরি করে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে।

অর্থাৎ প্রাথমিক অনুমোদিত অর্থের তুলনায় অতিরিক্ত ২১ লাখ টাকা ব্যয় দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। কেন এবং কোন প্রক্রিয়ায় মেরামত ব্যয় এতটা বৃদ্ধি পেল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ ক্ষেত্রে প্রকৃত মেরামত ব্যয়, ওয়ার্ক অর্ডার, অনুমোদন, যন্ত্রাংশ ক্রয়ের বিল এবং সংশ্লিষ্ট ভাউচার পরীক্ষা করলে প্রকৃত আর্থিক চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তদন্তের দাবি

অভিযোগকারীদের মতে, সাময়িক শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে গত এক বছরের হাজিরা খাতা, মজুরি বিল, পে-রোল এবং শ্রমিকদের ব্যাংক লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে গাড়ি মেরামতের ক্ষেত্রে অনুমোদিত অর্থ, পরবর্তী ব্যয়, ওয়ার্ক অর্ডার, যন্ত্রাংশ ক্রয়ের নথি ও ভাউচারও নিরপেক্ষভাবে যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তারা।

অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রমাণিত হলে তা শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করার পাশাপাশি সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় গুরুতর অনিয়মের বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শ্রমিক ও সাধারণ কর্মচারীরা।

এ বিষয়ে বিআরটিসি চেয়ারম্যান, সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং ডিপো ম্যানেজার মো. মফিজ উদ্দিনের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ