
নিয়োগ, বদলি, এনওসি বাণিজ্য ও বনভূমি দখলে সহায়তার অভিযোগ; উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি
বন অধিদপ্তরের ঢাকা সামাজিক বনাঞ্চলের বন সংরক্ষক হোসাইন মোহাম্মদ নিশাতের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়োগ-বাণিজ্য, বদলি সিন্ডিকেট, এনওসি প্রদানকে কেন্দ্র করে অনিয়ম এবং বনভূমি দখলে সহায়তার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বন বিভাগের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সালে ২২তম বিসিএসের মাধ্যমে সহকারী বন সংরক্ষক হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন হোসাইন মোহাম্মদ নিশাত। চাকরিজীবনের প্রায় ২৩ বছরে রাজধানীর বাইরে উল্লেখযোগ্য কোনো পদায়ন ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব ও উচ্চপর্যায়ের আশীর্বাদে তিনি দীর্ঘ সময় একই বলয়ের মধ্যে অবস্থান করে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৩ সালের জুলাই মাসে ঢাকা সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তার প্রভাব আরও বৃদ্ধি পায়। তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী কয়েকজন মন্ত্রী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুযোগে তিনি প্রশাসনিক ও আর্থিক বিষয়ে ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, তার দায়িত্বকালে সোনারগাঁও চেকপোস্টকে কেন্দ্র করে বিপুল অঙ্কের অবৈধ অর্থ লেনদেনের একটি ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। গাছবোঝাই ট্রাক চলাচল, বিভিন্ন পদে পদায়ন এবং চেকপোস্ট সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এছাড়া কাঠ ডিপো, করাতকল ও ইটভাটার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকেও নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
২০১৬ সালে সহকারী প্রধান বন সংরক্ষক (সংস্থাপন) পদে দায়িত্ব পাওয়ার পর দেশব্যাপী বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। বন বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বদলি এবং লাভজনক পদে পদায়নের ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বন্যপ্রাণী আমদানি ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ (এনওসি) প্রদানেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, নিয়মিত প্রক্রিয়ার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হতো এবং অর্থ প্রদান না করলে ফাইল নিষ্পত্তিতে বিলম্ব করা হতো। প্রতি মাসে বিপুলসংখ্যক এনওসি ইস্যুর মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী চক্র আর্থিক সুবিধা নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া বন বিভাগের নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। ২০২০ সালে পদোন্নতি নীতিমালার পরিবর্তন এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ সামনে আসে। বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, এসব নিয়োগে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং বিষয়গুলো তদন্তের দাবি রাখে।
অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা কেন্দ্রীয় বন অঞ্চলের অধীন গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ বনভূমি দখল ও ব্যবহার পরিবর্তনের ঘটনায় দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সীমানা নির্ধারণ ও ভূমি ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের সুযোগে বনভূমির উল্লেখযোগ্য অংশ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া এলাকায় বনভূমি দখল ও ব্যবহার পরিবর্তনের কয়েকটি আলোচিত ঘটনার সঙ্গেও তার নাম জড়িয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রভাবশালী মহলের স্বার্থ রক্ষায় প্রশাসনিক সহযোগিতা দেওয়ার মাধ্যমে এসব কর্মকাণ্ড সহজ করা হয়েছিল।
এদিকে, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও উঠেছে হোসাইন মোহাম্মদ নিশাতের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তার নামে কিংবা ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মাধ্যমে বিদেশে সম্পদ বিনিয়োগের তথ্যও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে হোসাইন মোহাম্মদ নিশাতের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানা সম্ভব হয়নি।
বন বিভাগের বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা মনে করেন, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে বন প্রশাসনের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রভাবের নেপথ্যের তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। তারা এ বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন।

