ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উত্থান

 

১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন বেনজীর আহমেদ। ধীরে ধীরে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সবচেয়ে প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তাদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ডিএমপি কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০১৫ সালে র‍্যাবের মহাপরিচালক হন। ২০২০ সালের এপ্রিলে তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ পুলিশ পদ আইজিপি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন।

রাজনৈতিক মহলে প্রচলিত ধারণা ছিল, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থাভাজন হওয়ায় তিনি প্রশাসনে দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন এবং একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান।

 

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা: বিতর্কের বড় মোড়

 

২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র র‍্যাব এবং এর সাতজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সেই তালিকায় ছিলেন বেনজীর আহমেদও।

গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে দেওয়া এই নিষেধাজ্ঞা তাঁর ক্যারিয়ারে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হয়। পরবর্তীতে আইজিপি পদ থেকে অবসরে যাওয়ার পর তাঁকে রাষ্ট্রদূত বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে নিয়োগ দেওয়া হয়নি, যা অতীতে অনেক সাবেক আইজিপির ক্ষেত্রে দেখা গেছে।

 

দুর্নীতির অভিযোগে সম্পদের পাহাড়

 

২০২৪ সালের শুরুতে বেনজীর আহমেদ ও তাঁর পরিবারের বিপুল সম্পদের তথ্য প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। এরপর ১৮ এপ্রিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের সম্পদ অনুসন্ধানে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করে।

দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী—

  • প্রায় ৮০০ বিঘা জমির মালিকানা
  • ঢাকার গুলশানে একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট
  • ৩৩টি ব্যাংক হিসাব
  • ১৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার
  • ৩টি বিও হিসাব
  • বিপুল পরিমাণ সঞ্চয়পত্র ও আর্থিক বিনিয়োগ

দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব সম্পদের বড় অংশের বৈধ উৎস পাওয়া যায়নি।

 

পরিবারও মামলার আসামি

 

দুর্নীতির মামলায় শুধু বেনজীর আহমেদ নন, তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়ের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয়েছে।

দুদকের তথ্যমতে—

  • স্ত্রী জীশান মীর্জার বিরুদ্ধে ৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগ
  • বড় মেয়ে ফারহীন রিশতার বিরুদ্ধে ৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগ
  • মেজ মেয়ে তাহসীন রাইসার বিরুদ্ধে ৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগ

এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁদের বিরুদ্ধেও মামলা করা হয়েছে এবং আদালতের নির্দেশে বিপুল সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।

 

দেশত্যাগ ও গ্রেপ্তার

 

দুদকের অনুসন্ধান শুরু হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই ২০২৪ সালের ৪ মে সপরিবারে দেশ ত্যাগ করেন বেনজীর আহমেদ।

সিসিটিভি ফুটেজ ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যায়, তিনি ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে দেশ ছাড়েন। তখন তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চললেও তাঁকে আটকানো হয়নি।

এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। অভিযোগ ওঠে, সরকারের উচ্চপর্যায়ের ‘সিগন্যাল’ পেয়েই তিনি দেশত্যাগের সুযোগ পান।

পরবর্তীতে তাঁর বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হয়। ২০২৬ সালের ১২ জুন দুবাইয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে বাংলাদেশ সরকার ও দুদক নিশ্চিত করেছে।

 

সংখ্যালঘুদের জমি দখলের অভিযোগ

 

বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুর অঞ্চলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জমি জবরদখল ও ভয়ভীতি দেখিয়ে ক্রয়ের অভিযোগ।

স্থানীয়দের দাবি, তাঁর প্রভাবের কারণে অনেক হিন্দু পরিবার বাধ্য হয়ে জমি বিক্রি করেছে। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, বিক্রি ছাড়া তাঁদের সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না।

এই জমিগুলোর ওপর গড়ে তোলা হয় বিশাল ‘সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক’।

 

সাভানা ইকো রিসোর্ট: বিলাসবহুল সাম্রাজ্যের উত্থান

 

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বৈরাগী টোল গ্রামে ৬০০ বিঘারও বেশি জমির ওপর নির্মিত হয় সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক।

রিসোর্টটিতে ছিল—

  • কৃত্রিম লেক ও জলাশয়
  • একাধিক কটেজ
  • রিসোর্ট অবকাঠামো
  • কৃষিজমি
  • মাছ চাষের পুকুর
  • বিনোদন ও পর্যটন সুবিধা

দুদকের আবেদনের পর আদালত রিসোর্টটি জব্দের নির্দেশ দেন। বর্তমানে জেলা প্রশাসন রিসোর্টটির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং বিভিন্ন সম্পদ সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে।

 

রূপগঞ্জে বিতর্কিত সম্পত্তি

 

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জেও বেনজীর পরিবারের মালিকানাধীন একটি বিলাসবহুল বাড়ি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় একটি জলাশয় ভরাট করে পরবর্তীতে সেটি তাঁর পরিবারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। পরে সেখানে ‘সাভানা ইকো রিসোর্ট প্রাইভেট লিমিটেড’ নামে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়।

 

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ

 

বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে মানবাধিকার লঙ্ঘন।

বিশেষ করে র‍্যাবের মহাপরিচালক থাকাকালে সংঘটিত বহু গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনায় তাঁর নাম আলোচনায় আসে।

এই অভিযোগগুলোর কারণেই যুক্তরাষ্ট্র তাঁর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয়।

 

শাপলা চত্বরের মামলায় আসামি

 

২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার অন্যতম আসামি বেনজীর আহমেদ।

সেই সময় তিনি ডিএমপি কমিশনার ছিলেন।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ওই ঘটনার সময় বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

 

গুমের মামলাতেও নাম

 

র‍্যাবের টিএফআই সেলে মানুষকে গুম করে রাখার অভিযোগে দায়ের হওয়া আরেকটি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাতেও আসামি বেনজীর আহমেদ।

এই মামলায় একাধিক সেনা কর্মকর্তা ও সাবেক র‍্যাব কর্মকর্তাও অভিযুক্ত।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলাটির বিচার প্রক্রিয়া চলছে।

 

পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে বিতর্ক

 

বেনজীর আহমেদ নিজ নামের আগে ‘ডক্টর’ ব্যবহার করতেন। ২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিবিএ) প্রোগ্রাম থেকে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।

কিন্তু পরে অভিযোগ ওঠে, ডিবিএ প্রোগ্রামে ভর্তির জন্য নির্ধারিত ন্যূনতম একাডেমিক যোগ্যতাই তাঁর ছিল না।

তদন্ত ও পর্যালোচনার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাঁর ডক্টরেট ডিগ্রি স্থগিত করে, যা দেশের উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

 

পাসপোর্ট জালিয়াতির অভিযোগ

 

২০১৬ সালে র‍্যাব মহাপরিচালক থাকা অবস্থায় সরকারি চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও বেসরকারি চাকরিজীবী পরিচয়ে পাসপোর্ট নবায়নের আবেদন করেন বেনজীর আহমেদ।

পাসপোর্ট অধিদপ্তর আপত্তি জানালেও পরে দ্রুততার সঙ্গে তাঁর পাসপোর্ট নবায়ন করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, তাঁর বাসায় গিয়ে ছবি ও আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করা হয়েছিল এবং পুরো প্রক্রিয়াটি বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়।

এ ঘটনায় দুদক পৃথক মামলা করেছে এবং তদন্ত এখনো চলমান।

 

বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙার পরীক্ষা

 

বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন সাবেক আইজিপি দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম, খুন, অবৈধ সম্পদ অর্জন, পাসপোর্ট জালিয়াতি ও ভূমি দখলের মতো বহুমাত্রিক অভিযোগে একসঙ্গে অভিযুক্ত হয়েছেন।

ক্ষমতার শীর্ষে থাকা একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এত বিস্তৃত তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া দেশের বিচারব্যবস্থার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন নজর আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া এবং দুবাই থেকে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন হয়, সেদিকে।

@(ঢাকাটাইমস/১৭ জুন/আরজেড)