
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে ক্ষতিপূরণ অনিয়মের অভিযোগ; তদন্ত প্রধানের নিরপেক্ষতা নিয়ে আপত্তি ভুক্তভোগীদের
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক আধুনিকায়ন প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েছেন তদন্ত কমিটির প্রধান এবং ঢাকার অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) মো. আজমল হোসেন। রোববার নরসিংদী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে তদন্ত কার্যক্রম চলাকালে ভুক্তভোগী কয়েকজন ব্যক্তি ও স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তদন্ত কার্যক্রমের সময় উপস্থিত কয়েকজন অভিযোগকারী দাবি করেন, ভূমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত বিতর্কিত কিছু সিদ্ধান্তের সঙ্গে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার নিজেও সম্পৃক্ত ছিলেন। এ কারণে তাকে তদন্ত কমিটির প্রধান করায় তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে তারা মন্তব্য করেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নরসিংদীতে ভূমি অধিগ্রহণের সময় ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে নানা অনিয়ম হয়েছে। এসব ঘটনায় সাবেক জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
প্রসঙ্গত, ভূমি অধিগ্রহণে অনিয়ম ও ক্ষতিপূরণ বণ্টনে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সরকারের বিভিন্ন সংস্থা পৃথক তদন্ত উদ্যোগ নেয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনার পর বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকেও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো নির্দেশনায় নরসিংদীর ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্ত করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, যার নেতৃত্বে রয়েছেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) মো. আজমল হোসেন।
তদন্ত কার্যক্রম চলাকালে কয়েকজন অভিযোগকারী দাবি করেন, ভূমি অধিগ্রহণের কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারের স্বাক্ষর রয়েছে। তাদের মতে, যেসব সিদ্ধান্ত এখন তদন্তের আওতায় এসেছে, সেগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তা তদন্তের নেতৃত্বে থাকলে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উঠতে পারে।
এদিকে নরসিংদী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সাবেক কানুনগো আব্দুল জলিলও কয়েকটি অধিগ্রহণ মামলায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরেছেন। তার দাবি, কিছু স্থাপনা সম্পর্কে মাঠপর্যায়ের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও সেগুলোকে ক্ষতিপূরণের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তিনি বিষয়গুলো পুনরায় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকটি ক্ষেত্রে স্থাপনার প্রকৃত অবস্থা এবং যৌথ তদন্ত প্রতিবেদনের মধ্যে অসঙ্গতি ছিল। তাদের দাবি, এসব অসঙ্গতির কারণে সরকারের বিপুল অঙ্কের অর্থ অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ হিসেবে বরাদ্দ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
নথিপত্র পর্যালোচনার দাবি করে অভিযোগকারীরা আরও বলেন, কয়েকটি অধিগ্রহণ মামলায় এমন কিছু স্থাপনা ও সম্পদের জন্য ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়েছে, যেগুলোর বাস্তব অস্তিত্ব বা প্রকৃত অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তারা এসব বিষয় স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের দাবি জানান।
তবে অভিযোগের বিষয়ে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) মো. আজমল হোসেন বলেন, তদন্তাধীন বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়।
তিনি বলেন, “১১ নম্বর এলএ কেসসহ যেসব বিষয়ে আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে, সেগুলো তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে স্থানীয় ভুক্তভোগী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের একটি অংশের দাবি, ভূমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হলে সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তারা স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। তাই ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ, সম্পত্তি যাচাই এবং প্রশাসনিক অনুমোদনের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় সরকারি অর্থের অপচয় এবং জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে বিষয়টি একাধিক তদন্ত সংস্থার পর্যালোচনার আওতায় রয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় এবং সম্ভাব্য অনিয়মের মাত্রা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে তদন্ত প্রতিবেদন ও পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়ার ওপর।

