রবিবার, মে ৩১, ২০২৬

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তার বি’রুদ্ধে অ’বৈধ সম্পদ ও ভূমি দখলের অ’ভিযোগ

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার সাবেক উচ্চমান সহকারী এবং বর্তমানে সাধারণ শাখার উপ-সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা এইচ. এম. আলী আজম খানের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, ভূমি দখল, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও তিনি এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ জমি, বাড়ি, ব্যাংক আমানত ও অন্যান্য সম্পদের মালিকানা গড়ে তুলেছেন। তাদের মতে, সম্পদের পরিমাণ ও জীবনযাত্রার ধরন সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত কয়েকটি সম্পদ বিতর্কের সঙ্গে তুলনীয়।

আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নের শোলকাটা গ্রামের মৃত মোজাম্মেল হক চৌধুরীর ছেলে এইচ. এম. আলী আজম খান বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনে কর্মরত রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, নিজের নামে ও বেনামে অর্জিত সম্পদের একটি বড় অংশ তিনি পরিবারের সদস্যদের নামে সংরক্ষণ করেছেন।

স্থানীয় একাধিক অভিযোগকারী ও ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সম্পদের প্রভাব ব্যবহার করে এলাকায় প্রভাব বিস্তার, জমি সংক্রান্ত বিরোধে চাপ প্রয়োগ এবং বিভিন্ন ধরনের হয়রানির অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, তাঁর প্রভাবের কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে অনিচ্ছুক।

১২ গণ্ডা জমি দখলের অভিযোগ

আনোয়ারার শোলকাটা গ্রামের বাসিন্দা মো. সমির উদ্দিন অভিযোগ করেন, তাঁর বৈধভাবে ক্রয়কৃত ও দখলীয় প্রায় ১২ গণ্ডা জমি জোরপূর্বক দখল করে সেখানে দেয়াল ও পিলার নির্মাণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করায় তাঁকে একাধিকবার প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

এ ঘটনায় তিনি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কাছে পৃথক লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।

স্ত্রীর নামে সাততলা ভবনের অভিযোগ

২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর দায়ের করা এক অভিযোগে বলা হয়, চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ থানার পূর্ব নাছিরাবাদ পলিটেকনিক এলাকার মোজাফফর নগর আবাসিক এলাকায় হাজী মোজাফ্ফর আহমদ চৌধুরী সড়কে ‘ড্যাফোডিল’ নামে একটি সাততলা ভবন রয়েছে।

অভিযোগকারীর দাবি, ভবনটি আলী আজম খানের স্ত্রী মোহছেনা আক্তারের নামে নির্মিত। স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগে বলা হয়েছে, জমিসহ ভবনটির বর্তমান বাজারমূল্য ২০ কোটির টাকারও বেশি।

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, ভবনটির বিদ্যুৎ মিটার নম্বর ০১০৪১০০৯৫৯২০ এবং ০১০৪১০০৯৪৮৪৮, যা মোহছেনা আক্তারের নামে নিবন্ধিত।

প্রিমিও গাড়ি ও সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন

অভিযোগ অনুযায়ী, আলী আজম খান চট্ট-মেট্রো-গ-১২-০৯০৮ নম্বরের একটি প্রিমিও গাড়ি ব্যবহার করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে কমিশন ও ঘুষের মাধ্যমে অর্জিত অর্থে এসব সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে।

এছাড়া তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে চট্টগ্রাম মহানগর ও আনোয়ারা এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমি ও সম্পদ ক্রয়ের অভিযোগও রয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকে পরিবারের সদস্যদের নামে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ জমা রয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

৫ কোটি টাকার জমি ক্রয়ের তথ্য

অভিযোগকারীর দাবি, আনোয়ারা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল নং-১৬৫৩, তারিখ ১২ এপ্রিল ২০১৮ অনুযায়ী প্রায় ৫ কোটি ২৩ লাখ ২০ হাজার টাকা মূল্যের ১০ একর জমি ক্রয় করা হয়।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই দলিলে আলী আজম খান নিজেকে ‘ব্যবসায়ী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যদিও তিনি সরকারি চাকরিজীবী।

কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ

২০২০ সালের ১ অক্টোবর চট্টগ্রামের একটি আঞ্চলিক দৈনিকে ‘কমিশনের চেক উড়ে এলএ শাখায়’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রমে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছিল।

অভিযোগকারীদের দাবি, ওই অনিয়মের সঙ্গে আলী আজম খান জড়িত ছিলেন এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধানের দাবি

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়ার পরও দীর্ঘ সময় দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে সম্প্রতি দুদকের একটি দল আনোয়ারায় তাঁর গ্রামের বাড়ি পরিদর্শন করেছে এবং সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে কাজ করছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।

যা বললেন আলী আজম খান

অভিযোগের বিষয়ে এইচ. এম. আলী আজম খান বলেন, তাঁর নামে কোনো জমি, ভবন বা গাড়ি নেই। যে ভবনের কথা বলা হচ্ছে সেটিও তাঁর নয়। তিনি আত্মীয়ের গাড়িতে চলাচল করেন বলে দাবি করেন।

তিনি আরও বলেন, জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলমান থাকায় প্রতিপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করছে। বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলাও রয়েছে বলে জানান তিনি।

প্রশাসনের বক্তব্য

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক কামরুজ্জামানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, তিনি এ বিষয়ে অবগত নন। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তদন্তসাপেক্ষ

প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্য ও অভিযোগগুলো অভিযোগকারী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো কোনো আদালত, তদন্ত সংস্থা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। বিষয়টি তদন্তাধীন এবং তদন্তের ফলাফলের ওপর চূড়ান্ত সত্যতা নির্ভর করবে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ