শুক্রবার, মে ২৯, ২০২৬

আলী রেজা হায়দারের বি’রুদ্ধে বিভাগীয় মা’ম’লা, ঘু’ষ-বাণিজ্য ও দু’র্নী’তির গুরুতর অ’ভিযোগ

সরকারি দায়িত্ব পালনে গাফিলতি, অনিয়ম ও অসদাচরণের অভিযোগে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, খুলনার সাবেক উপ-কমিশনার এবং বর্তমানে ঢাকা কাস্টম হাউসে কর্মরত কর্মকর্তা আলী রেজা হায়দারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তদন্ত শেষে তাকে ‘তিরস্কার’ দণ্ড দেওয়া হয়েছে।

তবে অভিযোগ শুধু প্রশাসনিক গাফিলতিতে সীমাবদ্ধ নয়। তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ব্যক্তিগত জীবনে নির্যাতনের অভিযোগও উঠেছে। একই সঙ্গে কাস্টমস সংশ্লিষ্ট দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ এবং একটি অবৈধ সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

তদন্তে বিলম্ব ও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ

সূত্র জানায়, ২০২১ সালে দুটি বিভাগীয় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান আলী রেজা হায়দার। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্ধারিত সময়সীমা ছিল ৩০ কার্যদিবস। কিন্তু তিনি এক বছরেরও বেশি সময় পর, ২০২২ সালের ২ নভেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন।

এনবিআর তার কাছে বিলম্বের কারণ জানতে চাইলে তিনি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হন। এতে অভিযোগ ওঠে যে, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে তদন্ত কার্যক্রম দীর্ঘায়িত করে ঘুষ লেনদেনের সুযোগ সৃষ্টি করেছিলেন। এ ঘটনায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তাকে ‘অসদাচরণ’-এর দায়ে অভিযুক্ত করা হয়।

ব্যক্তিগত জীবনে নির্যাতন ও দ্বিতীয় বিয়ের অভিযোগ

সরকারি দায়িত্ব পালনে অনিয়মের পাশাপাশি আলী রেজা হায়দারের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নুরে হুমাইয়া অভি নামের এক নারী দাবি করেন, আলী রেজা হায়দার তার স্বামী এবং দীর্ঘদিন ধরে তিনি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার।

তিনি অভিযোগ করেন, বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকা অবস্থায় আলী রেজা হায়দার অন্য এক নারীর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। পরে প্রথম স্ত্রীকে ছেড়ে নতুন স্ত্রীর সঙ্গে আলাদা বসবাস শুরু করেন।

এছাড়া ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিপুল পরিমাণ গোপন সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

ঢাকা কাস্টম হাউসে সিন্ডিকেট ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ

ঢাকা কাস্টম হাউসের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চোরাই পণ্য খালাস, ঘুষ লেনদেন এবং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন সহকারী ডেপুটি কমিশনার আলী রেজা হায়দার ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, বিমানবন্দর থেকে শুরু করে কাস্টমসের বিচার শাখা পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে এই সিন্ডিকেটের কার্যক্রম। এর ফলে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে এবং সাধারণ যাত্রীরা নানা ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

চোরাই পণ্য ছাড়ে অনিয়ম

অভিযোগ রয়েছে, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটক হওয়া মূল্যবান পণ্য অবৈধভাবে ছাড়িয়ে নিতে এই সিন্ডিকেট মোটা অঙ্কের ঘুষ আদায় করে।

এ ক্ষেত্রে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তারা সিন্ডিকেটের নির্দেশে দ্রুত খালাস প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন এবং বিনিময়ে ঘুষ গ্রহণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মাধ্যমে সরকার যেমন বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি সংশ্লিষ্টরা অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।

বিচার শাখায় যাত্রী হয়রানির অভিযোগ

ঢাকা কাস্টম হাউসের বিচার শাখায় যাত্রীদের হয়রানির অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সহকারী ডেপুটি কমিশনার আলী রেজা হায়দারের নির্দেশ ছাড়া এবং ঘুষ প্রদান ছাড়া কোনো ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয় না।

যেসব যাত্রী আগে থেকেই সিন্ডিকেটের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতা করেন, তাদের ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়। আর যারা ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানান, তাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করানোসহ বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

টাকার খাম ও গোপন লেনদেনের অভিযোগ

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, বিচার শাখায় প্রতিদিন বিভিন্ন ফাইল নম্বর উল্লেখ করে ঘুষের টাকার খাম পৌঁছে দেওয়া হয় সিন্ডিকেট সদস্যদের কাছে।

অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে এই অর্থ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয় এবং বিনিময়ে ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়।

কর্তৃপক্ষের নীরবতা

ঢাকা কাস্টম হাউসের এসব অভিযোগের বিষয়ে কাস্টমস কমিশনারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

কাস্টমস সংশ্লিষ্টদের মতে, সিন্ডিকেটের মূলহোতাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে দুর্নীতির মাত্রা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

কঠোর তদন্ত ও শাস্তির দাবি

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। তারা মনে করেন, এনবিআর, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং প্রশাসনিক সংস্থাগুলো দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে জনগণের আস্থা আরও কমে যাবে।

তাদের মতে, আলী রেজা হায়দারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ শুধু ব্যক্তিগত নয়; বরং তা সরকারি দায়িত্ব, নৈতিকতা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রশ্নও সামনে এনেছে। তাই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

বিশেষজ্ঞরা সরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কার্যকর বাস্তবায়নেরও আহ্বান জানিয়েছেন।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ