মঙ্গলবার, মে ৫, ২০২৬

৫ হাজারে ডিউটি, লাখে আয়! বিমান কার্গোতে দুর্নীতির সিন্ডিকেট ফাঁস

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ডিউটি রোস্টারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট—এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে একটি গোয়েন্দা তদন্ত প্রতিবেদনে। অভিযোগ রয়েছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ডিউটি দেওয়ার বিনিময়ে কার্গো হেলপারদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করছেন। গোয়েন্দা সংস্থার ওই প্রতিবেদনটি সম্প্রতি প্রকাশ্যে এসেছে, যেখানে এই অনিয়মের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

তদন্তে জানা যায়, আমদানি কার্গো সেকশনে কাজ পেতে হেলপারদের মাথাপিছু প্রতি মাসে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। এর বিনিময়ে তাদের নাম ডিউটি রোস্টারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এভাবে গড়ে ওঠা ‘রোস্টার বাণিজ্য’ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রতি মাসে প্রায় ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত অবৈধভাবে আয় করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, এই অর্থের বিনিময়ে ডিউটি পাওয়ার ফলে অনেক হেলপার পরবর্তীতে চুরি, জালিয়াতি এবং শুল্ক ফাঁকির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। সিন্ডিকেটের সহায়তায় আমদানিকৃত পণ্য খালাসে অনিয়ম এবং কাগজপত্র জালিয়াতির ঘটনা নিয়মিত ঘটছে।

সম্প্রতি একটি বড় ধরনের জালিয়াতির ঘটনাও সামনে এসেছে। তদন্তে বলা হয়, ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে চীন থেকে আমদানিকৃত ৪ হাজার ২৩৭ কেজি ফেব্রিকস কোনও ধরনের শুল্কায়ন ছাড়াই খালাস করা হয়। এই চালানটি ২০২৫ সালের ১৭, ২৩ ও ২৪ নভেম্বর তায়ানজিন এয়ার কার্গো এবং এসএফ এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে আনা হয় এবং একই বছরের ২৭ নভেম্বর ও ৭ ডিসেম্বর কার্গো থেকে অবৈধভাবে বের করে নেওয়া হয়।

তদন্তে বিমানের কার্গো বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা ও কাস্টমসের কিছু সদস্যের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে অভিযুক্ত হিসেবে একাধিক কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের মধ্যে রয়েছেন কমার্শিয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার, অ্যাসিস্ট্যান্ট কমার্শিয়াল ম্যানেজার, কমার্শিয়াল ম্যানেজারসহ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারা। এছাড়া কয়েকজন কার্গো হেলপারকেও এই চক্রের সঙ্গে জড়িত বলা হয়েছে।

উল্লেখ্য, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো সেকশনে বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রায় ১৩০ জন কর্মকর্তা এবং প্রায় ৭০০ জন হেলপার কর্মরত রয়েছেন।

এদিকে, রোস্টার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ‘অটোমেশন সিস্টেম’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত চক্রটি বিভিন্ন অজুহাতে এই অটোমেশন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অটোমেশন চালু হলে সবার জন্য সমানভাবে ডিউটি বণ্টন নিশ্চিত হবে এবং রোস্টার বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাবে।

প্রতিবেদনে অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, অন্যত্র বদলি এবং দ্রুত অটোমেশন সিস্টেম চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরিতে প্রশিক্ষণ বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের কেউ কেউ তা অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, তারা কোনও অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন এবং অটোমেশন ব্যবস্থার পক্ষেই রয়েছেন। অন্যদিকে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ