শুক্রবার, এপ্রিল ২৪, ২০২৬

কোটি টাকার বিনিময়ে অবৈধ স্লিপার বাসের ছাড়পত্রের অভিযোগ—বিআরটিএর পরিদর্শক আব্দুল খাবীরুকে ঘিরে বিতর্ক

দেশে অনুমোদনের কোনো বৈধ কাঠামো না থাকলেও মহাসড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে শত শত ‘স্লিপার বাস’। বিআরটিএ-এর নিয়ম ভেঙে এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি উপেক্ষা করে অবৈধভাবে এসব বাস পরিচালনা করা হচ্ছে। আমদানিকারক, বাস মালিক এবং বিআরটিএ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেট মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে এসব ঝুঁকিপূর্ণ যানের নিবন্ধন ও রুট পারমিট দিচ্ছে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, বিআরটিএ-এর কিছু অসাধু কর্মকর্তার দুর্নীতির কারণেই জননিরাপত্তা আজ চরম ঝুঁকির মুখে।

বিআরটিএ-এর নিয়ম অনুযায়ী, বাংলাদেশে স্লিপার বা ডাবল-ডেকার বাসের কোনো অনুমোদন নেই। যে সব চেসিসের ওপর এসব বাস তৈরি করা হচ্ছে, তা সাধারণত সিঙ্গেল-ডেকার হিসেবে নিবন্ধনের জন্য আসে। কিন্তু বাস মালিকরা বেশি মুনাফার লোভে এগুলোকে দোতলা বা স্লিপার কোচে রূপান্তর করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অশোক লিল্যান্ডসহ বিভিন্ন কোম্পানির ১২ মিটার চেসিসগুলো ইকোনমি ক্লাস ফরমেশনে ৪৫টি আসন বা ৩০টি স্লিপার সিটের জন্য ডিজাইন করা। কিন্তু এসব চেসিসের ওপর যখন অধিক উচ্চতার দোতলা বা স্লিপার বাস বানানো হয়, তখন গাড়িটির ভারকেন্দ্র (Center of Gravity) ঠিক থাকে না। ফলে দ্রুত গতিতে চলার সময় বাসগুলো দুলতে থাকে এবং যেকোনো সময় ভারসাম্য হারিয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়তে পারে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিআরটিএ-এর কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা অর্থের বিনিময়ে নিয়মের তোয়াক্কা না করে এসব অবৈধ বাসের নিবন্ধন দিচ্ছেন। এক্ষেত্রে বিশেষ করে ময়মনসিংহের বিআরটিএ সার্কেলের নাম উঠে এসেছে।

অভিযোগ রয়েছে, বিআরটিএ চাঁপাইনবাবগঞ্জের মোটরযান পরিদর্শক আব্দুল খাবীরু নিয়মবহির্ভূতভাবে এসব স্লিপার বাসের পরিদর্শন ছাড়পত্র প্রদান করেছেন। ৫ আগস্টের পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে তিনি প্রভাব বিস্তার করে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে মাত্র ৬ দিনে ১৯টি স্লিপার বাসের নিবন্ধন দিয়েছেন। এর আগেও তিনি ময়মনসিংহে থাকাকালীন অন্তত ১৬টি অবৈধ স্লিপার বাসকে নিবন্ধন দিয়েছেন, যার মধ্যে ১১টি ঢাকা-টেকনাফ এবং ৫টি ঢাকা-কক্সবাজার রুটে চলাচলের রুট পারমিট পেয়েছে।

অনুসন্ধান করে দেখা যায় পুরো ২০২৪ সাল জুড়ে অবৈধ স্লিপার কোচ বাসের নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালিয়ে গেছে এই সার্কেল অফিসে। ২০২৪ সালের ২৮ মার্চ থেকে ময়মনসিংহ-ব-১১-০২৫৬, ময়মনসিংহ-ব-১১-০২৫৭, ময়মনসিংহ-ব-১১-০২৫৯, ময়মনসিংহ-ব-১১-০২৬১, ময়মনসিংহ-ব-১১-০২৬৫,  ময়মনসিংহ-ব-১১-০২৬৮, ময়মনসিংহ-ব-১১-০২৭৫, ময়মনসিংহ-ব-১১-০২৭৬, ময়মনসিংহ-ব-১১-০২৭৯, ময়মনসিংহ-ব-১১-০২৮০, ময়মনসিংহ-ব-১১-০২৮৪, ময়মনসিংহ-ব-১১-০২৯০, ময়মনসিংহ-ব-১১-০২৯৩, ময়মনসিংহ-ব-১১-০২৯৬, ময়মনসিংহ-ব-১১-০২৯৭, ময়মনসিংহ-ব-১১-০২৯৮ পর্যন্ত ১৬ টি স্লিপার কোচ বাসের নিবন্ধন প্রদান করেছে বিআরটিএ। তবে নিবন্ধন নিয়ে এখানেই শেষ নয়। মোটা টাকার ঘুষের বিনিময়ে বিআরটিএ’র সদর কার্যালয় থেকে এই অবৈধ গাড়ি গুলো চলাচলের জন্য পেয়েছে রুট পারমিট।

ময়মনসিংহ বিআরটিএ’তে এইসব অপকর্ম চলমান থাকা অবস্থায় মোটাদাগে ঘুষ দিয়ে বিআরটিএ রাজশাহী সার্কেলে বদলীর জন্য সংস্থাটির সাবেক চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদারকে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতাদের মাধ্যমে তদবির চালিয়ে গিয়েছেন। খরচও করেছেন অনেক টাকা, তবে নুর মোহাম্মদ মজুমদার এই দুর্নীতিবাজদের কাছে দুর্বল হন নি। তবে ৫ আগষ্টের পরে ভোল পাল্টে তিনি হয়ে যায় বৈষ্যমের শিকার কর্মকর্তা। বিআরটিএ‘র বিদায়ী চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইয়াছিন যোগদানের পরে আবারো তিনি রাজশাহী সার্কেলকে টার্গেট করেন। বদলি নিতে আবারো মোটা অংকের তদবির চালিয়েছেন। সফল হয়েছেন ০৭ নভেম্বর ২০২৪ ৩৫.০৩.০০০০.০০১.১৯.১৭৬.২৪-১৮৪৯ নং আদেশ মূলে সার্কেলটির মোটরযান পরিদর্শক আব্দুল খাবীরুকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সার্কেলে বদলি করে কর্তৃপক্ষ।

মোটরযান পরিদর্শক আব্দুল খাবীরু বদলির জন্য ঘুষের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে আবারও দিয়েছেন অবৈধ স্লিপার কোচ বাসের নিবন্ধন। বদলির আগে মোটা অংকের টাকা কামানোর জন্য মোটরযান পরিদর্শক আব্দুল খাবীরু আবারও গাড়ির অবকাঠামোর ক্রটি, যান্ত্রিক ক্রটি ও আসন বিন্যাসে ক্রটির বিষয়টি জেনেও ঘুষ গ্রহণ করে এই সব স্লিপার বাস নিবন্ধনের জন্য পরিদর্শন ছাড়পত্র প্রদান করেন।

৫ আগষ্টের পরে গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে ৬ দিনে ১৯ টি স্লিপার কোচ বাসের নিবন্ধন প্রদান করেন এই  কর্মকর্তা। ময়মনসিংহ-ব-১১-০৩০২, ময়মনসিংহ-ব-১১-০৩০৩, ময়মনসিংহ-ব-১১-০৩০৫, ময়মনসিংহ-ব-১১-০৩০৬, ময়মনসিংহ-ব-১১-০৩০৯, ময়মনসিংহ-ব-১১-০৩১৪, ময়মনসিংহ-ব-১১-০৩১৫, ময়মনসিংহ-ব-১১-০৩১৬, ময়মনসিংহ-ব-১১-০৩১৭, ময়মনসিংহ-ব-১১-০৩১৮, ময়মনসিংহ-ব-১১-০৩২০, ময়মনসিংহ-ব-১১-০৩২৩, ময়মনসিংহ-ব-১১-০৩২৫, ময়মনসিংহ-ব-১১-০৩২৬, ময়মনসিংহ-ব-১১-০৩২৭, ময়মনসিংহ-ব-১১-০৩২৮, ময়মনসিংহ-ব-১১-০৩২৯, ময়মনসিংহ-ব-১১-০৩৩১, ময়মনসিংহ-ব-১১-০৩৩২ নং স্লিপার বাস গুলোর অবৈধ ভাবে রেজিষ্ট্রেশন নম্বর প্রদান করেছেন।

২০২০ সালের ৬ ডিসেম্বর বিআরটিএ-এর তৎকালীন চেয়ারম্যানের আদেশ অনুযায়ী, মোটরযান নিবন্ধনের সময় পরিদর্শককে ছবি তুলতে হবে এবং নথিতে সংরক্ষণ করতে হবে। কিন্তু এসব স্লিপার বাসের ক্ষেত্রে এই নিয়ম মানা হয়েছে কি না, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।

স্লিপার বাসের অনিয়ম কেবল কাগজপত্রে সীমাবদ্ধ নেই, এর পরিণতি হচ্ছে রক্তক্ষয়ী দুর্ঘটনা। গত ১৭ মে মিয়াবাজার হাইওয়ে থানাধীন এলাকায় রিলাক্স পরিবহনের একটি স্লিপার বাস (যশোর-ব-১১-০২৫১) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে ৫ জন নিহত হন। বিআরটিএ কুমিল্লার তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়, বাসটির আসন বিন্যাস অনুমোদিত ছিল না এবং পরিদর্শনের তোয়াক্কা না করেই চেসিস নম্বরের ভিত্তিতে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছিল।

এই সমস্ত অভিযোগের বিষয়ে জানতে  মোটরযান পরিদর্শক আব্দুল খাবীরু কে একাধিক বার কল দেয়া হলেও তিনি কলটি রিসিভ করেননি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর মতে, ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস পরিবহন খাত একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কব্জায় রয়েছে। ৫ মার্চ প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর আঁতাতের সামনে অনেক সময় সরকারও অসহায় হয়ে পড়ে।

এই পরিস্থিতির বিষয়ে বিআরটিএ-এর বিভাগীয় পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) জানান, বিআরটিএ কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত দুর্নীতির দায়ভার নেবে না। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। তবে বিআরটিএ সদর কার্যালয়ের রুট পারমিট শাখার উপপরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

স্লিপার বাসের মালিকদের অভিযোগ, তারা কোটি কোটি টাকা লগ্নি করেছেন। কিন্তু পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লাভের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। দ্রুত এসব ঝুঁকিপূর্ণ বাসের রুট পারমিট বাতিল এবং অবৈধ নিবন্ধনের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। অন্যথায়, সড়কের নৈরাজ্য ও প্রাণহানি কোনোভাবেই ঠেকানো সম্ভব নয়।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ