বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৩, ২০২৬

বিআরটিএতে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ! ‘অঘোষিত নবাব’ ফাহমে আজিজকে ঘিরে সিন্ডিকেট তৎপরতা

বিআরটিএ (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ) যেন এখন দুর্নীতির এক সায়ত্বশাসিত রাজ্য। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর দেশের সব প্রতিষ্ঠানে সংস্কারের ছোঁয়া লাগলেও, বিআরটিএ-তে এখনো উড়ছে বিগত আমলের সেই ‘সিন্ডিকেট’ নিশান। সংস্থাটির সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) নবাব ফাহমে আজিজ খানের ছত্রছায়ায় এখানে চলছে এক আজব ‘নবাবীয়ানা’।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার জন্য বিআরটিএ ভবনে যে কক্ষটি সংরক্ষিত, সেটি এখন ‘আওয়ামী সিন্ডিকেট’-এর ড্রয়িং রুমে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ ১৬ বছর এটি ওবায়দুল কাদেরের খাস কামরা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। অভিযোগ উঠেছে, এখনো সেখানে নিয়মিত আসর বসাচ্ছেন কাদেরের ঘনিষ্ঠ তিন সহচর—তানভীর হোসাইন, শাহিন হোসাইন ও মো. সোহেল। বিআরটিএ-র বর্তমান চেয়ারম্যান মীর আহমেদ তারিকুল ওমর বিষয়টি নিয়ে রীতিমতো বিব্রত ও চিন্তিত হলেও, নবাব ফাহমে আজিজের ‘প্রটোকল’-এর কারণে এই বহিরাগত সিন্ডিকেটকে উচ্ছেদ করা সম্ভব হচ্ছে না।

৫ আগষ্ট আওয়ামীলীগ সরকারের পতন হলে ১৬ বছর ধরে বিআরটিএতে রামরাজত্ব কায়েম করা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গা ঢাকা দেওয়া শুরু করেছিল। তবে এই সব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাবেক চেয়ারম্যান গৌতম চন্দ্র পালের মাধ্যমে সবাইকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আওয়ামী পন্থীদের ভগবান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন তিনি। গৌতম চন্দ্র পালকে ততাবধায়ক সরকার ওএসডি করলে নতুন দায়িত্বে আসেন বিপ্লবী সরকারের  চেয়ারম্যান মো. ইয়াছিন। তবে বিআরটিএ-র বর্তমান চেয়ারম্যান মীর আহমেদ তারিকুল ওমরকে বেকায়দায় ফেলতে  ও বিআরটিএর সেবা প্রশ্নবিদ্ধ করতে গণহারে জাল ড্রাইভিং লাইসেন্স তৈরির কাজ শুরু করেন নবাব ফাহমে আজিজের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এছাড়াও  সুপারিশ প্রাপ্ত ৩১ জন মোটরযান পরিদর্শকের নিয়োগে নবাবের নবাবীয়ানাও নিশ্চিত করেছেন দপ্তরটির একাধিক ভুক্তভোগী কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। তারা জানান বিআরটিএর মোটা অংকের ঘুষের টাকা আয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে সংস্থাটিতে কর্মরত অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিবারের সদস্যদের মোটরযান পরিদর্শক পদে সুপারিশপত্রে নাম উঠিয়ে নিজেকে ভগবানের চেয়ার বসিয়ে নেন নবাব ফাহমে আজিজ খান।

বিআরটিএ-র মোটরযান পরিদর্শক (১০ম গ্রেড) পদের নিয়োগ যেন এক আলাদিনের চেরাগ। সম্প্রতি দেখা গেছে, আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনের (APSCL) মতো লাভজনক প্রতিষ্ঠানের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ রানা ও রাসন চাকমার মতো কর্মকর্তারা, যারা লাখ টাকা বেতন ও পদোন্নতির দোরগোড়ায় আছেন, তারা সেই নিশ্চিত ক্যারিয়ার ছেড়ে ১৬ হাজার টাকা বেসিকের বিআরটিএ-র চাকরিতে আসতে মরিয়া।

কেন এই আত্মত্যাগ? উত্তরটি বিআরটিএ-র দেয়ালে দেয়ালে ঘুরছে—‘মোটা অংকের ঘুষ ও উপরি আয়’। এমনকি সেতু কর্তৃপক্ষের ৯ম গ্রেডের অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার শিমুল অধিকারীও নিচের গ্রেডে নামার জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। জনশ্রুতি আছে, নবাব ফাহমে আজিজ এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নিজের ‘নবাবী’ প্রভাব খাটিয়ে মোটা অংকের লেনদেনের বিনিময়ে একটি শক্তিশালী পরিবারতন্ত্র গড়ে তুলেছেন।

তবে এই নিয়োগে হাল ছাড়তে নারাজ বিআরটিএর পরিবার সিন্ডিকেট। সংস্থাটির সদর কার্যালয়ের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আব্দুল গাফফারের খালাতো ভাই বিআরটিএর মেহেরপুর সার্কেলে কর্মরত মেকানিক্যাল এসিস্ট্যান্ট জিয়াউর রহমান (পরিচিতি নম্বর-২০১৭৩২০১৩৫)। যার বিরুদ্ধে বছর দুয়েক আগে মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে স্থানীয় গ্যারেজে তৈরি করা মোটরযানের অবৈধ রেজিষ্ট্রেশন প্রদান করার অভিযোগ প্রমাণিত হলে তৎকালিন চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদারের সময়ে বিভাগীয় মামলা ও শাস্তি প্রদান করেন। এমন দুর্নীতিবাজরাও এবারের মোটরযান পরিদর্শক পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছে।

মোটরযান পরিদর্শক রাশেদ মিলনের ছোটভাই সংস্থাটিতে কর্মরত মেকানিক্যাল এসিস্ট্যান্ট খুলুদ হাসান ( রেজিষ্ট্রেশন নম্বর-৭০০০৪১),  অফিস সহকারী নজরুল ইসলামের ছেলে হাসিব ইসলাম হিমেল ( রেজিষ্ট্রেশন নম্বর-০০০০৯৭) সুপারিশ প্রাপ্ত হয়েছেন। এছাড়াও  মেকানিক্যাল এসিস্ট্যান্ট মো. মহিউদ্দিন ( রেজিষ্ট্রেশন নম্বর-০০০২৩৯) ২০২৫ সালের ২৩ জানুয়ারী প্রকাশিত বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন সচিবালয়ের ১৮.১২.২০২৪ তারিখের ৮০.০০.০০০০.৩০১ (গোপনীয়).১১.২৬৭২.২০২৪-৬৪ সংখ্যক স্বারকমূলে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অধীনে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট “জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর (টেক/পাওয়ার)” পদে ১০ম গ্রেড এ সুপারিশকৃত হয়ে কুমিল্লা পলিটেকনিক ইন্সস্টিটিউট এ পদায়ন হয় তবে সেখানে ঘুষ বাণিজ্যের কোন সুযোগ না থাকায় সেখানে যোগদান করেননি তিনি।

এছাড়াও উক্ত মোটরযান পরিদর্শক পদে সুপারিশ প্রাপ্ত হওয়া জনৈক মোহাম্মদ হালিমের পুত্র জিহছান (রেজিষ্ট্রেশন নম্বর-০০১০৪১) ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ফলাফল প্রকাশিত না হওয়ার সত্ত্বেও মিথ্যা তথ্য দিয়ে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে মোটরযান পরিদর্শক পদে নিয়োগের আবেদন করেছিলেন। এই বিষয়ে ১০ মার্চ বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (নন ক্যাডার) বরাবরে জাল জালিয়াতির বিষয়ে আবেদন করেন সুপারিশ পত্র থেকে বাদ পড়া আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, হামিদ আকন্দ রবিন, শেফায়েত উল্লাহ, রুহুল আমিনসহ অনেকে। এই ঘটনা তদন্তপূর্বক সত্যতা পাওয়ায় আজ ১৭ মার্চ বাংলাদেশ সরকারী কর্ম কমিশন সচিবালয়ের নম্বর- ৮০.০০.০০০০.৩০১ (গোপনীয়) ১১.২৬৫০, ২০২৪-৪৮ সংখ্যক স্বারকে মো. জিহছান (রেজিষ্ট্রেশন নম্বর-০০১০৪১) বাতিল করে পিএসসি। এইসব নিয়োগের সাথে নবাব ফাহমে আজিজ ও আওয়ামী সিন্ডিকেটের একটি যোগসাজশ রয়েছে বলে সুত্রে প্রকাশ।

মোটরযান পরিদর্শক পদে নিয়োগে আবেদন করা বেশ কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই নিয়োগের বিষয় গুলো নবাব ফাহমে আজিজ খান নিয়ন্ত্রণ করতেন। মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে এই নিয়োগ কার্যক্রম হয়েছে। ফলে এই নিয়োগে অনেক মেধাবীরা বাদ পড়েছেন। বিআরটিএর দীর্ঘ দিনের পরিবার তন্ত্র বাস্তবায়নে এবারও জয়জয়কার।

বিআরটিএর সূত্র বলছে, সংস্থাটি গঠনের পর থেকে সাবেক পরিচালক (ইঞ্জিঃ) আশরাফুজ্জামান, সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) এনায়েত হোসেন মন্টু, আব্দুল জলিল ও মোটরযান পরিদর্শক আব্দুল বারীগংদের পরিবারতন্ত্রের মধ্যে দিয়ে বিআরটিএতে নিয়োগ কার্যক্রম হতো। ২৪ শের আন্দোলনের পরেও বিআরটিএর পরিবার তন্ত্র বহাল রয়েছে। কোন ধরণের সংস্কার না করে আওয়ামীলীগ সরকারের সেই নিয়োগ বাস্তবায়িত হওয়ায় অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

অফিস রুমে শুয়ে বসে সময় কাটানো ব্যক্তিরা কি করেন ? সাম্প্রতিক সময়ে বিআরটিএর বেশ কয়েকটি বদলিতে অনিয়ম হওয়ার বিষয়টি সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারিদের মুখে মুখে। এই সকল ব্যক্তিরা শুধু নয় নবাব ফাহমে আজিজ খান সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে বিআরটিএর বদলি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করেন তাঁরা। মো. সোহেল বিভিন্ন সার্কেল অফিস থেকে নবাব এর নামে মাসিক মাসোয়ারা আদায় করেন। এছাড়াও বদলি বাণিজ্যের টাকা গ্রহণ ও বিতরণের জন্য মো. সোহেল ও শাহিন হোসেনকে ব্যবহার করতেন তিনি। ৫ আগষ্টের পরেও বিআরটিএর নোয়াখালী সিন্ডিকেটের আওয়ামী পন্থিদের পছন্দের সার্কেলে বদলি করার জন্য বিভিন্ন স্থানে মিটিং ও দেন দরবার চালাচ্ছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছেন।

ড্রাইভিং লাইসেন্স জালিয়াতি: 

বিআরটিএ যখন সাধারণ গ্রাহককে স্মার্ট কার্ড দিতে ‘ব্যর্থ’ হচ্ছে, তখন পর্দার আড়ালে জাল লাইসেন্স প্রিন্ট করার মহোৎসব চলছে। ৫ আগস্টের পর থেকে নবাব ফাহমে আজিজ ও  সাবেক সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরর বিশ্বস্ত সহচর মাগুরা জেলা আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুল রেজার নেতৃত্বে একটি চক্র শত শত ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স বাজারে ছেড়েছে।।

বান্দরবান সার্কেল:

BANP23046 থেকে শুরু করে প্রায় ৩২টি লাইসেন্স নম্বরের হদিস পাওয়া গেছে, যেগুলো সম্পূর্ণ জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি।

রেফারেন্স নং- BANP23046, BAMP1305478, BAMP1298995, BAMP1304972, BANP1300253, BANP1309028, BANP1311906, BANP1321619, BANP1321316, BANP1321419, BANP1306761, BANP1309609, BANP1307331, BANP1322856, BANP1315791, BANP1319879, BANP1316281, BANP1311026, BANP1307231, BNB2308NP112, BNB2308NP120, BNB2308NP106, BNB2308NP115, BNB2308NP104, BNB2308NP108, BNB2308NP105, BNB2308NP111, BNB2308NP110, BNB2308NP127, BNB2308NP125, BNB2308NP107, BNB2407NP118 নং লাইসেন্স গুলো জাল জালিয়াতির মাধ্যমে করেছেন বলে জানা যায়।

বরিশাল সার্কেল: 

পারভেজ মিয়া, মাসুম মিয়া থেকে শুরু করে ২৪ জনের একটি দীর্ঘ তালিকা পাওয়া গেছে, যাদের লাইসেন্স ডাটাবেজে থাকলেও প্রক্রিয়াগতভাবে সেগুলো অবৈধ।

রেফারেন্স নম্বর- BSNP51009/21 PARVES MIAH, BSNP67003/21 MASUM MIA, BSNP50933/21 Tamimul Ihsan, BSNP68030/21 MD ZAKIR HOSSEN, BSNP51300/21 ANWAR HUSSAIN, BSNP68301/21 MUKTADIR AHMED, BSNP52007/21 MD MAMUN AHMED, BSNP53601/21 MD FOYSAL MAHMUD, BSNP69040/21 MAHBUB ALAM, BSNP53010/21 AHMED HOSSAIN, BSNP52159/21 OMAR BHUIYAN, BSNP50026/21 SYED ZAKARIA AHMED, BSNP50698/21 SHIFUR RAHMAN SHIPO, BSNP5960/21 MOHAMMED HABIBUR RAHMAN, BSTP31879/21 Shakibul Azam, BSNP51909/21 Muhibur Rahman, BSNP49608/21 MD RASHED, BSNP50481/21 FAYSAL AHMAD, BSP39016/21 Khaled Khan, BSTP36017/21 Shah Jamal Hussain, BSTP36003/21 Shahid Hasan, BSNP59061/21 HARIS ALI MD, BSNP50260/21 MD MIJANUR RAHMAN, BSNP50093/21 MD MASUD RANA

বিআরটিএ-র সদর দপ্তরের করিডোরে কান পাতলে শোনা যায়, সহকারী পরিচালক নবাব ফাহমে আজিজ খানই এখন সব কলকাঠি নাড়ছেন। বদলি বাণিজ্য থেকে শুরু করে মাসিক মাসোয়ারা সংগ্রহ—সবই চলছে তার ইশারায়। সংস্কারের এই সময়ে বিআরটিএ কি এই ‘নবাবী’ সিন্ডিকেট মুক্ত হবে, নাকি উপদেষ্টার কক্ষে বসে থাকা ওবায়দুল কাদেরের প্রেতাত্মারা এভাবেই প্রতিষ্ঠানটিকে গ্রাস করে রাখবে? উত্তরটি এখন সময়ের অপেক্ষায়।লোকে বলে বিআরটিএ মানেই ভোগান্তি। কিন্তু নবাব ফাহমে আজিজদের জন্য বিআরটিএ মানেই ‘বসন্ত’। সাধারণ মানুষ যখন লাইসেন্সের জন্য হাহাকার করছে, নবাবরা তখন উপদেষ্টার এসি রুমে বসে ভবিষ্যতের বদলি বাণিজ্যের ছক কষছেন!

অভিযোগের বিষয়ে জানতে নবাব ফাহমে আজিজ খানের মোবাইলে কল দেওয়া হলে তিনি রিসিভ করেন নি।

@durnitirdiary

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ