
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)–এর একদল প্রভাবশালী কর্মচারীর পদোন্নতিকে ঘিরে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে-বাইরে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিমসহ কয়েকজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সুবিধা নিশ্চিত করতে কোর্টের ‘ভুল রায়’কে হাতিয়ার বানিয়ে ১২ জনকে উপসহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে; আর এ সুযোগে সরকারের কাঁধে চাপে অতিরিক্ত প্রায় পাঁচ কোটি টাকার বেতন–বকেয়ার বোঝা।
জানা গেছে, এলজিইডির বিভিন্ন পদের মোট ২৪ জন কর্মচারী পদোন্নতির দাবিতে হাইকোর্টে রিট করেন (মামলা নং ৮৪৩১/২০১১)। সূত্র অনুযায়ী, এ মামলার প্রথম শুনানি হয় ২০১২ সালের ২৬ জুলাই, দ্বিতীয় ও শেষ শুনানি ১৬ অক্টোবর ২০১২ আর রায়ের তারিখ দেখানো হয়েছে ১৫ অক্টোবর ২০১২। অর্থাৎ শেষ শুনানির একদিন আগেই রায় দেওয়া হয়েছে বলে আদালতের নথিতে উল্লেখ আছে – যা আইনজ্ঞদের কাছে গুরুতর অনিয়ম ও ‘ধোঁয়াশাপূর্ণ’ বলে বিবেচিত হচ্ছে। আইনজীবী মহলের একাংশের মন্তব্য, এমন অস্বাভাবিক তারিখ বিভ্রাট ইঙ্গিত দেয়—রায়টি ফরমায়েশি, ভুয়া নাকি স্বচ্ছ; তা নিজেই প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
সার্ভেয়ার–কার্য সহকারী থেকে উপসহকারী প্রকৌশলী। রিটকারী ২৪ জনের মূল পদ কারও সার্ভেয়ার, কারও কার্য সহকারী, কারও কমিউনিটি অর্গানাইজার, আবার কেউ স্টোর কিপার। এদের মধ্যে কেউ ইতোমধ্যে অবসরে গেছেন, কেউ মারা গেছেন। অবশিষ্ট ১২ জনকে—যারা অভ্যন্তরীণভাবে ‘ওহাব গ্রুপ’ নামে পরিচিত এবং যাঁদের দলনেতা আব্দুল ওহাব—বিতর্কিত এ রায়ের আলোকে উপসহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
কোর্টের রায়ে উল্লেখ ছিল, তাদের চাকরি রাজস্ব খাতে স্থায়ী করার কথা। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা যায়, যাদের নিয়ে এই রায়, ওই ১১/১২ জনের চাকরি শুরু থেকেই রাজস্ব খাতেই ছিল এবং এখনো আছে। অর্থাৎ যেটি বাস্তবে আগে থেকেই কার্যকর, সেটিকেই কাগজে–কলমে নতুন করে ‘স্থায়ী’ দেখিয়ে পরবর্তীতে পদোন্নতির ভিত্তি বানানো হয়েছে বলে অভিযোগ। সূত্র জানায়, ২০১২ সালে রায় হওয়ার পর এলজিইডির আইন শাখার কিছু কর্মকর্তা ঘুষের বিনিময়ে ওহাব গ্রুপকে পরামর্শ দেন এবং তদবিরের মাধ্যমে রিটের রায় বাস্তবায়ন না করার ব্যবস্থা নেন। এতে প্রায় এক দশক ধরে রায়টি কার্যকর হয়নি। এ সময়ের মধ্যে এলজিইডিতে ১৬ জন প্রধান প্রকৌশলী দায়িত্বে ছিলেন। কেউই এই রায়কে ভিত্তি করে পদোন্নতি বাস্তবায়নে এগিয়ে আসেননি। সাবেক দুই অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও একাধিক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “রায়ে যে ভুল আছে এবং নিয়োগ বিধির সঙ্গে তা সাংঘর্ষিক—এই কারণে কেউ ঝুঁকি নেননি।”
ঘুষের টাকায় ‘ফান্ড’ তৈরি, শুরু হয় লবিং চলতি বছরের শুরু থেকে ওহাব গ্রুপ মোটা অংকের একটি ফান্ড তৈরি করে পদোন্নতি আদায়ে জোর তৎপরতা শুরু করে। অভিযোগ আছে, এ ফান্ড থেকেই শুরু হয় এলজিইডির উচ্চপদস্থদের আর্থিক প্রলোভনে ফেলার প্রক্রিয়া।
সূত্রের দাবি, প্রথম দফায় সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রশীদ মিয়াকে ৫০ লাখ টাকা ঘুষ দেয় ওহাব গ্রুপ। রশীদ মিয়া সংশ্লিষ্ট ফাইলে নড়াচড়া শুরু করলেও প্রশাসন শাখার কয়েক কর্মকর্তা কোর্টের এই ‘ভুল রায়’ বাস্তবায়নের ফাইলে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে তিনি শেষ পর্যন্ত পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন জারি করতে পারেননি। পরবর্তীতে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া আনোয়ার হোসেন–এর আমলেও ওহাব গ্রুপ প্রজ্ঞাপন বের করানোর চেষ্টা চালায়। কিন্তু প্রশাসনিক আপত্তি ও বিধিবহির্ভূততার কারণ দেখিয়ে সেই প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়। জাবেদ করিমের আমলে ‘দেড় কোটি’র দফা–রফা বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিম দায়িত্ব নেয়ার পরই ওহাব গ্রুপ আবার সক্রিয় হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, তারা সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী (প্রশাসন) শফিকুর রহমানকে ‘মূল টার্গেট’ হিসেবে ধরে।
সূত্রের দাবি, আব্দুল ওহাব সরাসরি শফিকুর রহমানের বাসায় গিয়ে দেড় কোটি টাকায় দফা–রফা করেন। অভিযোগ অনুযায়ী: এই ১.৫ কোটি টাকার মধ্যে ১ কোটি টাকা যায় প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিমের কাছে, ৩০ লাখ টাকা নেন সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী (প্রশাসন) শফিকুর রহমান, বাকি ২০ লাখ টাকা নেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) সাইফুল কবির। এই আর্থিক লেনদেনের বিনিময়েই কোর্টের বিতর্কিত রায়কে ‘অস্ত্র’ বানিয়ে ওহাব গ্রুপের ১২ জনের পদোন্নতি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় বলে অভিযোগ। কোর্টের রায়েও ‘শর্ত’, তাতে আবার কৌশল কোর্টের ওই রায়ে আরও বলা আছে—“পদ শূন্য থাকার প্রেক্ষিতে পদোন্নতি দেয়া যেতে পারে”। প্রশ্ন হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট সময়ে সেই পদগুলো আসলেই শূন্য ছিল কিনা, তা নিয়ে কোনো স্বাধীন যাচাই–বাছাই হয়েছে কি না। এদিকে ওহাব গ্রুপের ১২ জন শুধুই পদোন্নতিই পাননি; একই সঙ্গে ২০০৬ সাল থেকে উপসহকারী প্রকৌশলী স্কেলে বেতন পাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অথচ কোর্টের রায়ে কোথাও কোন তারিখ থেকে অর্থপ্রদান কার্যকর হবে তা উল্লেখ নেই।
কিন্তু প্রজ্ঞাপনে সে রকম ‘ইফেক্টিভ ডেট’ যোগ করে দেওয়ায় ওই ১২ জন ২০০৬ সাল থেকে বকেয়া বেতন দাবি করার সুযোগ পেয়েছেন। আর এ বকেয়া বেতন বাবদ সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা, যা ইতোমধ্যেই অর্থ বিভাগে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিয়োগ বিধি কড়া, বাস্তবায়ন ঢিলা: এলজিইডির সর্বশেষ নিয়োগবিধি–২০০৯ অনুযায়ী—সার্ভেয়ার পদে চাকরির বয়স ১৫ বছর পূর্ণ হলে, কার্য সহকারী পদে চাকরির বয়স ২০ বছর হলে, এবং বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সাপেক্ষে, তাও আবার পদ শূন্য থাকলে, উপসহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতির সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, কমিউনিটি অর্গানাইজার ও স্টোর কিপার পদ থেকে কখনোই টেকনিক্যাল পোস্ট—উপসহকারী প্রকৌশলী—এ পদোন্নতির কোনো সুযোগ নেই। নিয়োগবিধি এ বিষয়ে স্পষ্ট ও কঠোর। কিন্তু ওহাব গ্রুপের ক্ষেত্রে এই সব বিধান উপেক্ষা করে, শুধুমাত্র কোর্টের প্রশ্নবিদ্ধ রায়কে হাতিয়ার বানিয়ে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সাবেক দুই অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও এলজিইডির বর্তমান একাধিক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এই প্রতিবেদককে বলেন, “নিয়োগ বিধি লঙ্ঘন করে কোর্টের ভুল বা অস্পষ্ট রায়ের ভিত্তিতে যে ১২ জনের পদোন্নতি হয়েছে, তা সম্পূর্ণ অনৈতিক এবং প্রশাসনিকভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।”
আইন মন্ত্রণালয় ও পদোন্নতি কমিটির এখতিয়ার প্রশ্নের মুখে : আইন মন্ত্রণালয় বা এলজিইডির পদোন্নতি কমিটির কোনো এখতিয়ার নেই প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদিত নিয়োগবিধির ব্যত্যয় ঘটিয়ে কারও পদোন্নতি দেয়ার—এমন মতই সংশ্লিষ্ট অনেক বিশেষজ্ঞের। তাঁদের মতে, আদালতের রায়ও যদি প্রণীত বিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তা হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হয় বিষয়টি স্পষ্টীকরণের জন্য পদক্ষেপ নেয়া—অন্ধভাবে বাস্তবায়ন করে বসা নয়।
কিন্তু ওহাব গ্রুপের ক্ষেত্রে ঠিক তার উল্টো চিত্র দেখা গেছে বলে অভিযোগ।
কারা লাভবান, কারা ক্ষতিগ্রস্ত: ওহাব গ্রুপের পদোন্নতিতে—ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়েছেন, সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী (প্রশাসন) শফিকুর রহমান, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) সাইফুল কবির, প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিম, এবং ওহাব গ্রুপের সংশ্লিষ্ট ১২ জন পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, রাষ্ট্রের কোষাগার (বাড়তি প্রায় পাঁচ কোটি টাকা বকেয়া বেতন), নিয়োগবিধি মেনে তবু পদোন্নতি পাননি—এমন বহু যোগ্য কর্মকর্তা-কর্মচারী,
এলজিইডির সামগ্রিক ভাবমূর্তি ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা। ব্যবস্থা নেয়ার দাবি, এলজিইডির ভেতরে–বাইরে একাধিক কর্মকর্তা, অভিজ্ঞ প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট মহল দাবি তুলেছেন— ওহাব গ্রুপের এই বিতর্কিত পদোন্নতি দ্রুত পুনর্বিবেচনা করে স্বচ্ছ তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। নিয়োগবিধি লঙ্ঘন, ঘুষ বাণিজ্য ও কোর্টের রায়ের অপব্যাখ্যার সঙ্গে যারা জড়িত—প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিম, সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী (প্রশাসন) শফিকুর রহমান, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) সাইফুল কবির এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের যেসব কর্মকর্তা অনুমোদন প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন—তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতি দাবি উঠেছে— এই পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে ঘুষ–দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম, নিয়োগবিধি লঙ্ঘন ও আদালতের রায়ের অপব্যবহার—সবকিছুই খতিয়ে দেখে দায়ীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো “ওহাব গ্রুপ”–এর জন্ম না হয়।

