Tuesday, August 25, 2026

টেন্ডার বাণিজ্য থেকে সম্পদ অর্জন—গণপূর্তের উজির আলীকে ঘিরে নানা প্রশ্ন

গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. উজির আলীকে ঘিরে টেন্ডার, প্রকল্প বাস্তবায়ন, কমিশন লেনদেন, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, দায়িত্ব পালনে অনিয়ম এবং বিপুল সম্পদ অর্জনসহ নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ও ক্রয় কার্যক্রমে তিনি প্রভাব বিস্তার করেছেন।

তবে উজির আলীর বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ এখনো কোনো স্বাধীন তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

দীর্ঘ সময় ঢাকাকেন্দ্রিক দায়িত্ব

গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় ১৭ বছরের শাসনামলে উজির আলী মাত্র চার মাসের মতো ঢাকার বাইরে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি প্রায় দেড় বছর ধরে গণপূর্ত অধিদপ্তরের রক্ষণাবেক্ষণ (মেইনটেন্যান্স) জোনের দায়িত্বে রয়েছেন বলেও সূত্রগুলো জানিয়েছে।

একই কর্মকর্তার দীর্ঘ সময় ধরে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, সরকারি চাকরিতে দীর্ঘ সময় একই এলাকার গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ কীভাবে তৈরি হয়েছে এবং এর পেছনে কোনো প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক প্রভাব ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

আজিমপুরে শ্রমিক নিহতের ঘটনায় দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন

২০২২ সালের ২২ এপ্রিল রাজধানীর আজিমপুরে জাজেস কমপ্লেক্সে নির্মাণকাজ চলাকালে ১০ তলা থেকে পড়ে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়। ওই সময় সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বে ছিলেন উজির আলী।

অভিযোগ রয়েছে, নির্মাণস্থলে শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও ব্যবস্থা যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। এ কারণে ঘটনাটিতে দায়িত্বে অবহেলার প্রশ্নও ওঠে।

ওই প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ছিল নুরানী কনস্ট্রাকশন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, একই সময়ে আজিমপুর এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির আরও কয়েকটি কাজ চলছিল এবং প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে উজির আলীর কথিত কমিশন লেনদেন নিয়েও গণপূর্তের অভ্যন্তরে আলোচনা ছিল। তবে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের রায় প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।

আজিমপুর কলোনির কাজ বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন

আজিমপুর কলোনিতে ২০ তলা ভবন নির্মাণ প্রকল্পের কাজ বণ্টন নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, দুটি ভবনের কাজ কুশলী নির্মাতা, তিনটি মাসুদ অ্যান্ড কোং এবং চারটি হাসান অ্যান্ড সন্সকে দেওয়া হয়।

অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, এসব কাজ বণ্টনের সময় দরপত্র মূল্যায়ন, ঠিকাদারদের যোগ্যতা নির্ধারণ এবং কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের প্রভাব বা অনিয়ম হয়েছিল কি না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।

তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় উজির আলী একটি প্রভাবশালী ঠিকাদারি বলয় গড়ে তুলেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

কেরানীগঞ্জ কারাগার প্রকল্পের অভিযোগ

কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার নির্মাণ প্রকল্পেও উজির আলীর দায়িত্ব পালন ও প্রকল্পসংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সূত্রের দাবি, ওই প্রকল্পে প্রায় এক বছর দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

প্রকল্পটির বিভিন্ন অনিয়ম তদন্তে গঠিত একটি গোপন কমিটির নথিতে ৩৭ কর্মকর্তার নাম থাকার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ওই তালিকায় কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ ছিল, তদন্তের চূড়ান্ত ফল কী এবং উজির আলীর বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ্যে নেই।

জি কে শামীমকে অতিরিক্ত বিল দেওয়ার তদন্তে উজির

আলোচিত ঠিকাদার জি কে শামীমকে অতিরিক্ত বিল পরিশোধের ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটির সঙ্গেও উজির আলীর সম্পৃক্ততার কথা জানা যায়। ২০২১ সালের ওই ঘটনায় তিনি তদন্ত কমিটিতে ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

অভিযোগ রয়েছে, ওই ঘটনায় জড়িত প্রকৌশলী ফজলুল হক মধুকে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে তুলনামূলক লঘু শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে উজির আলীর ভূমিকা ছিল। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে উজির আলীর বক্তব্য ভিন্ন। তাঁর দাবি, তদন্ত কমিটির দায়িত্ব ছিল অতিরিক্ত পরিশোধ করা অর্থ কীভাবে ফেরত আনা যায়, সে বিষয়ে সুপারিশ করা। কে দায়ী বা কাকে শাস্তি দেওয়া হবে, সেটি নির্ধারণ করা কমিটির কাজ ছিল না।

এলটিএমের পরিবর্তে ওটিএম নিয়ে অভিযোগ

২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের শতভাগ বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা বা এপিপির কাজ লিমিটেড টেন্ডার মেথডের (এলটিএম) পরিবর্তে ওপেন টেন্ডার মেথডের (ওটিএম) মাধ্যমে করার অনুমোদন দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে উজির আলীর বিরুদ্ধে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে পরিচিত কিছু ঠিকাদার সুবিধা পেয়েছেন এবং এর বিনিময়ে কমিশন লেনদেন হয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রকাশ্য তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।

ফলে দরপত্র পদ্ধতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত বিধিসম্মত ছিল কি না, এতে প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়েছিল কি না এবং কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কি না—এসব বিষয় স্বাধীনভাবে যাচাই করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিপুল সম্পদের অভিযোগ

উজির আলীর বিরুদ্ধে ওঠা সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো তাঁর বিপুল সম্পদ অর্জন। গণপূর্ত অধিদপ্তরের একটি সূত্রের দাবি, তাঁর নামে-বেনামে শত শত কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, রাজধানীর উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের ৭ নম্বর সড়কে তাঁর একটি ছয়তলা বাড়ি, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ডি ব্লকে একটি ফ্ল্যাট এবং ধানমন্ডিতে প্রায় ২ হাজার বর্গফুটের আরেকটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এ ছাড়া গাজীপুরে তাঁর স্ত্রীর নামে প্রায় পাঁচ একর জমি থাকার অভিযোগও রয়েছে।

তবে এসব সম্পদের মালিকানা, ক্রয়মূল্য, বর্তমান বাজারমূল্য এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। তাই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে তাঁর আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, জমির দলিল, ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের তথ্য পরীক্ষা করার দাবি উঠেছে।

রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ

উজির আলীর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগও করেছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা।

এমনকি ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে অর্থের জোগান দেওয়ার অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে। তবে জুলাই-আগস্টের সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডসংক্রান্ত কোনো মামলায় তিনি অভিযুক্ত বা আসামি কি না, তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আদালতের নথি যাচাই ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।

অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, তাঁর বিরুদ্ধে এ ধরনের কোনো মামলা বা তদন্ত থাকলে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল পদে তাঁর বর্তমান অবস্থান কীভাবে বহাল রয়েছে।

অভিযোগ অস্বীকার উজির আলীর

তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে মো. উজির আলী বলেন, তিনি কখনো অতিরিক্ত ক্ষমতার অপব্যবহার করেননি। দপ্তর থেকে তাঁকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তিনি সেটিই পালন করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন বলেও দাবি করেন তিনি।

প্রতিবেদনে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে এবং তিনি যেসব বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন, সেগুলো যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ভবিষ্যতে তাঁর পক্ষ থেকে নতুন কোনো তথ্য বা বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে।

তদন্তের দাবি

উজির আলীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি দীর্ঘদিনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের অংশ—তা নির্ধারণের জন্য নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, তাঁর দীর্ঘ ১৭ বছরের পোস্টিং ইতিহাস, গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে দায়িত্ব পালনের নথি, দরপত্র অনুমোদন ও মূল্যায়নসংক্রান্ত কাগজপত্র, সম্পদ বিবরণী, আয়কর রিটার্ন, ব্যাংক লেনদেন এবং পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে আজিমপুরে শ্রমিক নিহতের ঘটনা, কেরানীগঞ্জ কারাগার প্রকল্প, জি কে শামীমকে অতিরিক্ত বিল পরিশোধের তদন্ত, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এলটিএম থেকে ওটিএমে পদ্ধতি পরিবর্তন এবং বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর কথিত যোগাযোগও পৃথকভাবে খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাঁদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আর অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে উজির আলীকেও অভিযোগ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়মুক্ত করা সম্ভব।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সরকারি অর্থের ব্যবহার, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই মূল বিষয়। তাই উজির আলীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে ব্যক্তি নয়, বরং প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই এখন সংশ্লিষ্টদের প্রধান প্রত্যাশা।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ