বৃহস্পতিবার, জুন ১৮, ২০২৬

১৪৪ কেজি গাঁ’জা থেকে মা’ম’লায় ৬০ কেজি! এসআই জনিসহ ৪ পুলিশ সদস্যের বি’রুদ্ধে আ’ত্ম’সাতের অ’ভিযোগ

কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার এসআই (নিঃ) জনি কান্তি দে, এএসআই মো. কবির হোসেন, এএসআই আলী আহমেদ এবং কনস্টেবল জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে একটি মাদক মামলায় জব্দকৃত গাঁজার বড় অংশ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগটি করেছেন মামলার ১ নম্বর আসামি ও পিকআপচালক মিজান। তবে এ অভিযোগ ঘিরে মামলার এজাহার, আসামিদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে থাকা বিভিন্ন তথ্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ভারতীয় গাঁজার একটি চালান বহনের সময় পিকআপচালক মিজানকে আটক করে পুলিশ। পরে দায়ের করা মামলার এজাহারে ৬০ কেজি গাঁজা উদ্ধারের কথা উল্লেখ করা হয়। তবে গ্রেপ্তার হওয়া আসামি মিজানের দাবি, তার পিকআপে মোট সাত বস্তায় ১৪৪ কেজি গাঁজা ছিল। তার অভিযোগ, সেখান থেকে প্রায় ৮৪ কেজি গাঁজা সরিয়ে ফেলার পর মাত্র ৬০ কেজি গাঁজা জব্দ দেখিয়ে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়।

জামিনে মুক্ত হওয়ার পর গণমাধ্যমে দেওয়া ভিডিও বক্তব্যে মিজান স্বীকার করেন যে উদ্ধার হওয়া গাঁজা তার ছিল এবং তিনি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তবে একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, পুলিশের সদস্যরা তার পিকআপ থেকে উদ্ধার হওয়া চার বস্তা বা প্রায় ৮৪ কেজি গাঁজা অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন।

মিজানের ভাষ্যমতে, তাকে ভাগলপুর এলাকা থেকে আটক করা হলেও মামলার এজাহারে গ্রেপ্তারের স্থান হিসেবে চৌয়ারা বাজারের ফুলতলী এলাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, সুয়াগাজী বাজারের উত্তর-পশ্চিম পাশে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসংলগ্ন একটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের পাশের সড়কে তার পিকআপ থামিয়ে একটি সিএনজি ডেকে আনা হয় এবং তার সামনেই চার বস্তা গাঁজা অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়।

এদিকে একই মামলার ২ নম্বর আসামি হিসেবে সদর দক্ষিণ উপজেলার মুড়াপাড়া গ্রামের কলেজ শিক্ষার্থী ইকরাম হোসেনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে গণমাধ্যমে দেওয়া ভিডিও বক্তব্যে ইকরাম দাবি করেন, তিনি কখনো মাদক ব্যবসা বা মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না এবং তাকে অন্যায়ভাবে মামলার আসামি করা হয়েছে।

ইকরাম বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। আমার এলাকার ১০ জন মানুষের মধ্যে যদি দুইজনও বলতে পারেন আমি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তাহলে প্রশাসন যে শাস্তি দেবে আমি তা মেনে নেব।”

তিনি আরও দাবি করেন, তিনি একজন কলেজ শিক্ষার্থী এবং অতীত বা বর্তমান কোনো সময়েই মাদক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তাই প্রকৃত ঘটনা তদন্তের মাধ্যমে তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি জানান।

অন্যদিকে মিজান অভিযোগ করেন, গ্রেপ্তারের পর এসআই জনি কান্তি দে তাকে তার ভাগিনা ইকরামের নাম বলার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। প্রায় এক মাস ২৭ দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হয়ে নিজের মোবাইল ফোন ফেরত চাইতে থানায় গেলে পুনরায় ইকরামের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে বলা হয় বলেও দাবি করেন তিনি।

মিজানের অভিযোগ, এতে রাজি না হওয়ায় তাকে ইয়াবা দিয়ে নতুন মামলা দেওয়ার পাশাপাশি শারীরিক ক্ষতির হুমকি দেওয়া হয়।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, পিকআপের চালকের ডান পাশের সিটে থাকা একজন ব্যক্তি পালিয়ে যান। তবে এ বিষয়টিও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ বাংলাদেশে ব্যবহৃত অধিকাংশ পিকআপ ভ্যানে চালকের ডান পাশে পৃথক যাত্রী আসনের বিষয়টি সাধারণত দেখা যায় না। ফলে এজাহারে বর্ণিত ঘটনার যথার্থতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে এসআই (নিঃ) জনি কান্তি দের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।

তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। এ বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে পারেন।”

১৪৪ কেজি গাঁজার মধ্যে ৮৪ কেজি সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি অভিযোগটি নাকচ করে দেন। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন করেন, “আপনি মাদক কারবারির পক্ষে আমাকে কল করেছেন কেন?” পরে তিনি পুনরায় দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই।

ইকরামকে কোন তথ্যের ভিত্তিতে মামলার আসামি করা হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে এসআই জনি কান্তি দে বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া আসামির প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়া গেলে তার নাম বাদ দেওয়া হবে।

এদিকে এসআই জনি কান্তি দের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে জানতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুল ইসলামের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে ব্যস্ততার কথা জানিয়ে পরে কথা বলার অনুরোধ করেন। তবে পরবর্তী সময়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তারও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

ঘটনাটিকে ঘিরে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। যদি আসামি মিজানের দাবি অনুযায়ী প্রকৃতপক্ষে ১৪৪ কেজি গাঁজা উদ্ধার হয়ে থাকে, তাহলে মামলায় মাত্র ৬০ কেজি গাঁজা উল্লেখ করা হলো কেন? আবার যদি তার অভিযোগ ভিত্তিহীন হয়, তাহলে তিনি এমন দাবি করছেন কেন? একই সঙ্গে গ্রেপ্তারের স্থান, আসামি অন্তর্ভুক্তির ভিত্তি এবং জব্দকৃত মাদকের পরিমাণ নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তারও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা, তা নির্ধারণে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, জেলা পুলিশ প্রশাসন কিংবা প্রয়োজনে স্বাধীন তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের দাবি উঠেছে। কারণ, মাদকবিরোধী অভিযানে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ